ধূমপানের ফলে প্রতি বছর ৬০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়, পরোক্ষ ধূমপানে মারা যান আরও ৮.৯ লক্ষ
“আমাদের দেশে ধূমপানের বিরুদ্ধে আইন এখনও যথেষ্ট কড়া নয়”
- Total Shares
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (হু) ৩১ মে দিনটিকে ওয়ার্ল্ড নো টোব্যাকো ডে ঘোষণা করেছে। বিশ্ব তথা সমস্ত দেশে ধূমপান ও তামাক সেবনের ক্ষতিকারক দিকগুলো নিয়ে সচেতনা বাড়ছে ও বিভিন্ন প্রচার কর্মসূচিও চলছে। এবারের থিম 'তামাক হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে'।
আজ কোটি কোটি মানুষ ধূমপানের শিকার যার ফলে ক্যান্সার সহ অনান্য প্রাণঘাতী সব রোগে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। তাই বিশ্ব জুড়ে এখন ধূমপানের বিরুদ্ধে চিকিৎসক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ প্রচার চালাচ্ছেন।
হু-র রিপোর্ট অনুযায়ী প্রত্যেক বছর তামাক সেবনের কারণে অন্তত ৬০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। তা ছাড়া যাঁরা এই ধূমপায়ীদের কাছাকাছি থাকেন কিংবা ধূমপায়ীদের সঙ্গে বসবাস করেন, অর্থাৎ পরোক্ষে য়াঁদের শরীরে ধোঁয়া প্রবেশ করে, তেমন অন্তত ৮,৯০,০০০ লোকের মৃত্যু হয় প্রতিবছর। সিগারেটের ধোঁয়ায় চার হাজারেরও বেশি রাসায়নিক আছে যার মধ্যে অন্তত ২৫০টি রাসায়নিক শরীরের ক্ষতি করে এবং অন্তত ৫০টি রাসায়নিক ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
ধূমপানের ফলে ক্যান্সার-সহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ হতে পারে
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অংশুমান মুখোপাধ্যায়ের জানিয়েছেন যে, ধূমপান করলে বা তামাকের সেবন করলে ফুসফুস, মস্তিস্ক, মুখের ভিতরের বিভিন্ন রোগ ও হৃদপিণ্ডের নানা সমস্যা হয়। অংশুমান মুখোপাধ্যায় বলেন, "ধূমপান করলে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সিওপিডি হলে শ্লেষা, প্রচণ্ড কাশি, শ্বাসকষ্ট হয় ও ধীরে ধীরে ফুসফুস তার স্বাভাবিক কাজগুলো আর করতে পারে না। বেশি ধূমপান করলে যে ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে সে বিষয়টা আমাদের আর অজানা নেই।"
এ বার আসি এবারের হৃদয়ের ক্ষতির কথায়। আগেই যেমন বলেছি এবারের থিম হল ধূমপান বা তামাক কী ভাবে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে। তিনি বলেন, "ধূমপান করলে করোনারি আর্টারির বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় যার ফলে স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত কিংবা ইস্কিমিক হার্টের মতো রোগও হতে পারে। যাঁরা ধূমপান করেন তাঁদের কাছাকাছি যে সব মানুষজন থাকেন তাঁদের শরীরেও ধোঁয়া প্রবেশ করলে মারাত্মক সব হৃদ সমস্যা দেখা দেয়, এবং তাঁদের ও ফুলফুসের ক্যান্সার হওয়া আশঙ্কা থাকে প্রবল।"
তিনি মুখোপাধ্যায় বলেন যে সিওপিডি বা করোনারি হার্টের রোগে আক্রান্ত হয়ে যাঁরা আসেন তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই ধূমপায়ী। যদিও অন্যান্য কারণেও সিওপিডি বা হৃদরোগ হতে পারে কিন্তু বেশিরভাগ রোগী যাঁরা এই শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তাঁদের বেশির ভাগই ধূমপান করেন।
মহিলাদের মধ্যেও তামাক সেবনের মাত্রা বাড়ছে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন মহিলাদের মধ্যেও তামাক সেবনের মাত্রা বাড়ছে। মহিলাদের মধ্যে তামাক সেবন, বিড়ি ও ধূমপানের প্রবণতা ক্রমশই বাড়ছে। মহিলাদের ক্ষেত্রেও কিন্তু সমস্যাগুলো একই রকমের যদিও যেসব মহিলারা ধূমপান করেন বা তামাক খান তাঁদের সন্তান ধরণে সমস্যা হতে পারে।
দেশে ধূমপানের বিরুদ্ধে আইন এখনও যথেষ্ট শক্ত নয়
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পার্থ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, "সিগারেটের ধোঁয়ায় নিকোটিন, সায়ানাইড, কার্বন মনোক্সাইড, শিসা-সহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে বলে যে সব মহিলা ধূমপান করেন তাঁদের সন্তান ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গের ক্ষতি হয়। ধূমপান সন্তানধারণের ক্ষমতাও কমে যায়। গর্ভাবস্থায় ধূমপান করলে শুধু গর্ভবতী মহিলারই নয় হবু সন্তানেরও নানা রকম ক্ষতি হয়। ধূমপানের কারণে গর্ভবতী মহিলার উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। এর ফলে সেই মহিলার প্রিক্লামসিয়া বা এক্লাম্পসিয়ার মতো প্রাণঘাতী সমস্যা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় ধূমপান করলে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সন্তানের জন্ম হতে পারে কিংবা অনেক সময় গর্ভের বাচ্চা অপরিণত থেকে যায়, গভর্স্থ সন্তানের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সন্তান জন্ম নিলে সে বিকলাঙ্গ হতে পারে, অন্য রোগেরও শিকার হতে পারে। অনেক সময় শিশুটির জন্মগত আরও অন্য সমস্যা যেমন গন্নাকাটা, কিংবা মুখের তালুতে সমস্যা অথবা হৃদরোগ থাকতে পারে।"
ই ধরণের প্রচার কর্মসূচি লাগাতার চালিয়ে যেতে হবে
পার্থ মুখোপাধ্যায় বলেন, গর্ভবতী যে সব মহিলা পরোক্ষ ভাবে ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন তাঁদের শারীরিক সমস্যাগুলোও একই রকমের হয়। তাই সুস্থ বাচ্চা ও সুস্থ মায়ের জন্য গর্ভবতী মহিলাদের কোনও ভাবে ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত থাকাটা উচিৎ নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আমাদের দেশে ধূমপানের বিরুদ্ধে আইন এখনও যথেষ্ট কড়া নয়। শুধু মাত্র সিগারেটের প্যাকেটে বিজ্ঞাপন মানুষকে ধূমপানের থেকে বিরত করতে পারবে না। তাই শুধু মাত্র একটি দিনকে বেছে নিলে চলবে না, এই ধরণের প্রচার কর্মসূচি লাগাতার চালিয়ে যেতে হবে।

