কলকাতার কল্পতরু ভাণ্ডারের একখিলি পান ১০০১ টাকা

বাঙালির পানাভ্যাস বেড়েছে আর হারিয়ে যাচ্ছে পান খাওয়ার অভ্যাস

 |  5-minute read |   29-10-2018
  • Total Shares

খেয়েদেয়ে উঠে মুখে একখিলি পান। মুখে খিলি ঢোকানোর পরে প্রথমবার চাপটা দিতেই ঠোঁটের দু’কোণ দিয়ে রস বেরিয়ে আসবে। কোনওক্রমে সেই রস টেনে বা মুছে নিয়ে দ্বীতিয়বার চাপ। তারপরে অলস দুপুরে ধীরে ধীরে পান চিবোতে চিবোতে দিবানিদ্রা। মা-দিদিমার এই অভ্যাস দেখেনি এমন বাঙালি পাওয়া মুশকিল।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু আবার মায়ের মুখের চিবানো পান খেতে ভালোবাসত। সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও আমার দিদিমার চিবানো পান খেয়েছি। কতক্ষণ চিবানোর পরে তিনি পান দিতেন তার একটা হিসাব ছিল। যখন জর্দার নির্যাস ফুরিয়ে যেত, তখন দিতেন, না হলে মাথা ঘুরবে যে!

kal_emb_pan_102918032540.jpgপান ছাড়া বাঙালির ভুরিভোজ অসম্পূর্ণ রয়ে যায় (ছবি: সুবীর হালদার)

শ্রাদ্ধবাড়িতে পান দিতে হয়, মিঠাপাতা-সাদাপানই সাধারণত দেওয়া হয়ে থাকে। বিয়েবাড়িতে আজকাল পানের চল নেই বললেই চলে। ফুচকার স্টল থাকে, আইসক্রিমের স্টল থাকে, পানের বেলাতেই যত কার্পণ্য। মশলার একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলেই যেন কাজ শেষ। এ কেমন বিচার?

“আসলে আমাদের অবস্থাটা দুর্গাপুজোর পুরোহিতের মতো, বুঝলেন। কোটি টাকা বাজেটের পুজো, আর পুরোহিতের বেলায় দু’চার হাজার দিলেই হল, তাঁর যেন কোনও গুরুত্বই নেই। আজকাল বিয়েবাড়িতে লোকে পান দেয়ই না। তাই আমাদের পানের চাহিদাও কমেছে।” আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন শ্যামল দত্ত। কল্পতরুর বর্তমান কর্ণধার। তিনিই মালিক, তিনিই দোকানদার। যে পান আসলে হজমির কাজ করে, সেটা কেন বন্ধ হয়ে গেল, তার কোনও যুক্তি তিনি খুঁজে পান না।

কল্পতরু ভাণ্ডার। কলকাতার কলেজ স্টিটে ছোট্ট একটা পানের দোকান। ভিতরে পান-মশলার সঙ্গে গাদাগাদি করে আছে শংসাপত্র। তাঁদের অনেকের সঙ্গে দোকানের পুরোনো মালিকের ছবিও রয়েছে – তিনি পান দিচ্ছেন। এই তালিকায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সর্বেপল্লি রাধাকৃষ্ণন, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, শিল্পী মান্না দে... আরও কত নাম। হাল আমলের বহু স্বনামধন্য ব্যক্তি তাঁদের প্রশংসা করেছেন।

কল্পতরু ভাণ্ডারে এক খিলি পানের দাম ৫ টাকা থেকে ১০০১ টাকা। তাদের নামও আছে – মুখরঞ্জন (৫ টাকা), মুখবিলাস (১১ টাকা), দিলখোস (২১ টাকা), মন মাতোয়ারা (৫১ টাকা), বেনারস রুচি (৫০১ টাকা) ও বাদশাহী (১০০১ টাকা)।

kal_emb_price_102918032707.jpgমূল্যতালিকা: পান শুধু নামীই নয়, দামিও (ছবি: সুবীর হালদার)

এত দাম কেন? শ্যামলবাবু বলেন, “যেমন গুড় ঢালবেন তেমন মিষ্টি হবে।” সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু লোকে তো আর পান কামড়ে কামড়ে খায় না, একটা খিলিতে তো ধরাতে হবে! “সে তো বটেই। যত দামি পান খান না কেন, একটা খিলি একেবারেই মুখে ঢুকে যাবে। দামটা মশলার, কায়দাটা পান সাজার। বাপ-কাকাদের আমল থেকে আমরা মশলা নিয়ে নানারকম গবেষণা করে আসছি। আমরা কোনও একটা কিছু চালু করলাম, তার কয়েক মাসের মধ্যে অন্য দোকানগুলো সেগুলো নকল করতে শুরু করে দিল। তাতে কোনও আক্ষেপ নেই। আমরা আবার নতুন মশলা বানালাম।”

মশলা আসে দেশের নানা জায়গা থেকে। সুপারির উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন শ্যামলবাবু, “ধরুন সুপারি। অসম থেকেও আসে আবার চেন্নাই থেকেও আসে। কী ধরনের পান সেই অনুযায়ী সুপারি কাটা হয়। কোনওটা কাগজের মতো পাতলা, কোনওটা একটু মোটা, তবক দেওয়া। এটাকে বলা হয় ডলার সুপারি। মিস্টি পানের সঙ্গে পাতলা সুপারি দেওয়া হয়। আবার লম্বাটে এক ধরনের সুপারি ব্যবহার করি যা স্বাদে মিঠা, তবে লবঙ্গের নির্যাস আছে। আমরা এটার নাম দিয়েছি লঙ্কেশর। আবার মেওয়া সুপারি নামে এক ধরনের সুপারি ব্যবহার করি, সেটাও আমরা বাড়িতে বানাই।”

kal_emb_shyamal_102918032822.jpgপান সাজার কায়দাটাই আলদা এই দোকানে (ছবি: সুবীর হালদার)

কল্পতরুর পান কেন বরফের উপরে রেখে সাজা হয় না? সহাস্যে উত্তর দিলেন শ্যামলবাবু, “বরফের উপরে পান রেখে সাজা আমরাই প্রথম চালু করি। কিন্তু পরে দেখলাম যে কেউ যদি মনে করেন পান কিনে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে খাবেন, বা বন্ধুদের খাওয়াবেন, তখন সেই পান ঠান্ডা তো থাকেই না, উল্টে হেজে যেতে পারে। সে জন্য এখন এমন একটা জিনিস ব্যবহার করি যাতে মোটামুটি তিন সপ্তাহ থেকে এক মাস পান ঠিক থাকে।”

সাজা পান লোকে একমাস পরে খাবে কেন?

শ্যামলবাবু বললেন, “ধরুন দুর্গাপুজোর সময় বিদেশ থেকে বোন এসেছেন, এখানে। বিজয়ার পরে ফিরে যাবেন বিদেশে। সেখানে তাঁর ভাইও থাকেন। ভাইফোঁটায় ভাইকে পান খাওয়াবেন। তখন আমরা সেই ভাবে পান বানিয়ে দিই। পাতা থেকে রস বার করে নিই, যাতে পচে না যায়। তারপরে পান সেজে খিলি তৈরি করি। দিন পাঁচ-সাত একই করম থাকে। তার মধ্যেই তাঁরা সেই পান ফ্রিজে রেখে দেন। যখন খান তখন সেই পানের পাতাটুকু শুকনো থাকে বটে, তবে স্বাদের বিন্দুমাত্র হেরফের ঘটে না। তানজানিয়াতে প্রতি বছর আমি এই পান পাঠাই। তা ছাড়া দুবাই-সহ মধ্যএশিয়াতে আমাদের মশলা নিয়মিত যায়।”

kal_emb_masala_102918032938.jpgএই সব মশলা পাড়ি দেয় বিদেশেও (ছবি: সুবীর হালদার)

বারাণসী, এলাহাবাদ, লখনৌ থেকে মশলা এনে নিজেদের মতো করে বানিয়ে তা বিক্রি করে কল্পতরু। মূলত মিঠা পান, তবে জর্দা পানও পাওয়া যায়। তাঁরা বারাণসী থেকে নিজেদের জন্য জর্দা তৈরি করিয়ে আনেন।

আমি যখন নিজে জর্দা পান কিনতাম মায়ের জন্য তখন ৫৫,৬০,১২০ বা ৩০০ জর্দা কিনতাম। তাদের স্বাদ-গন্ধ আলাদা, কড়া ভাবেরও পার্রক্য হয়। ৫৫ মানে সুরভি, ৬০ মানে গোপাল, ১২০ মানে বাবা, ৩০০ মানে রত্না। এখানে কতটা কড়া জর্দা পাওয়া যায়?

শ্যামলবাবু বলেন, “আমাদের নিজস্ব জর্দার আলাদা কোনও মাত্রা নির্ধারণ করা নেই। আমাদের কাছে হয়তো কেউ এসে বললেন যে অমুক জর্দা দিন। আমি বলেই দিই যে আমাদের নিজস্ব জর্দা আছে, খেয়ে দেখতে পারেন। তাঁর খান, খেয়ে বলেন – ঠিকই আছে।”

বিয়ে বাড়িতে কোনও দিন স্টল দেয় না কল্পতরু। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে নাম খারাপ হতে পারে বলে, তবে অর্ডার পেলে বানিয়ে দেয়। দোকানে মোটামুটি ১১ ও ২১ টাকার পানের বিক্রিই বেশি। অনেক সময় লোকে শখ করে ৫১ টাকার পানও খেয়ে দেখে। তার চেয়ে দামি পান সাধারণ ভাবে বিদেশে যায়। দিনে কম করে হলেও ৫০-৬০ খিলি পান বিক্রি হয়। তবে বিয়ের মরসুমে অর্ডার অনুযায়ী পান সরবরাহ করেন শ্যামল দত্ত।

কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ার ঐতিহ্য রয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, কয়েকটা সাহেবি আমলের স্কুল, বিখ্যাত বইপাড়া, মহাবোধি সোসাইটি, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট, কফি হাউস, দুর্গাপুজো... তার মধ্যে কল্পতরু ভাণ্ডার। তাই এখান থেকে কোনও শপিং মলে উঠে গিয়ে ঐতিহ্য হারাতে চান না শ্যামল দত্ত।

kal_emb_prez_102918033045.jpgরাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণনের পাশে পান সাজছেন কল্পতরুর কর্ণধার 

কল্পতরুর ইতিহাস বেশ পুরনো। পূর্ববঙ্গের ঢাকায় স্বর্ণব্যবসায়ী ছিলেন এই দত্ত পরিবার। ঢাকায় ৮৭ বছর আগে তাঁরা পানের ব্যবসা শুরু করেন তিন ভাই রাধাবিনোদ দত্ত, নির্মলকুমার দত্ত ও সনাতন দত্ত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় তাঁরা কলকাতায় চলে আসেন, পানের ব্যবসা চালিয়ে যান। কোথায় কী মশলা পাওয়া যায় সে ব্যাপারে তাঁদের ধারনা আগে থেকেই ছিল, বাঙালি মাত্রই পানের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর রাখেন, শহর ছেড়ে বাইরে গেলে পানের মশলার খোঁজ করেন।

তবে দত্ত পরিবারের কর্তারা তার চেয়ে একটু এগিয়ে নিজেরাই পান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, ধীরে তাঁদের পান অন্য মাত্রা পেতে থাকে। একই সঙ্গে তিন ভাই পান খাওয়াতে থাকেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। প্রথমে শহরের, তারপরে শহরের বাইরে, সবশেষে একেবারে দেশের রাজধানীতে পৌঁছে যান।

dscn6911_102918033203.jpgকল্পতরুর পান হাতে রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডু

নিজেদের অনন্যতা বোঝাতে তাঁরা নেতাদের মাধ্যমে দিল্লিতে যোগাযোগ করতে থাকেন। তখনকার দিনে নিরাপত্তার এত কড়াকড়ি ছিল না, তাই কখনও রাষ্ট্রপতি,কখনও প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে তাঁদের হাতে পান তুলে দিয়েছেন। পেয়েছেন শংসাপত্র। বর্ধমানের রানির হাতেও দিয়েছেন একখিলি পান। সাদাকালো ব্রোমাইডে সেই মুহূর্ত বন্দি করেছেন। পসার বেড়েছে কল্পতরুর।

রাধাবিনোদ দত্তের ছেলে শ্যামল রাজ্য সরকারের বিদ্যুৎ দপ্তেরর চাকরি ছেড়েছেন এই পানের দোকানের জন্য। চাকরি করলে এখন তাঁর অবসরের খুব বেশি বাকি থাকত না। তাঁর এক মেয়ে গৃহবধূ, জামাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তা হলে দোকানের কী হবে? একটু ম্লান হাসেন শ্যামল। “জানি না। এই কাজ কে করবে?”

আসল কথাটাই বলা হয়নি, সারা দেশে বাংলা থেকে পান গেলও কল্পতরুর পান আসে ভুবনেশ্বর থেকে। মিঠা পান। বাংলা পাতা ও ঝালপাতায় তাঁরা কোনও পান সাজেন না। কোনও কারণে যদি ভুবনশ্বর থেকে পান আনা সম্ভব না হয়, তা হলে স্থানীয় বাজার থেকে তিনি পান সংগ্রহ করেন।

বাঙালির পানাভ্যাস বেড়েছে আর পান খাওয়ার অভ্যাস গিয়েছে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment