লক্ষ্মীর বাহন কেন পেঁচা? পেঁচা নিয়ে গ্রিস ও মিশরের বিশ্বাসে তফাত কী

প্রাচীন মিশরে একমাত্র পেঁচার ছবিতেই একটি ব্যতিক্রম দেখা যায়

 |  3-minute read |   23-10-2018
  • Total Shares

দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাব কী ভাবে, তা নিয়ে কোন পুরাণে কী বলেছে সে সব থাক। তার চেয়ে বরং নজর ঘুরিয়ে দেখা যাক তাঁর বাহন পেঁচার দিকে।

লক্ষ্মীপেঁচা। দুধসাদা ছোট্ট সেই পেঁচা নাকি সৌভাগ্যের প্রতীক। শিকারি পাখি পেঁচা, সে যখন ওড়ে তখন বাতাস কাঁপে না বলে শিকারও টের পায় না। সম্পদও আহরণ করতে হয় নিঃশব্দে, আর তা রক্ষাও করতে হয় অতন্দ্র ভাবে। নিশাচর পেঁচা তাই হয়তো দেবীর বাহন।

lakshmimod_102318081536.jpgএমন পটের লক্ষ্মীপ্রতিমা পুজো হয় বাঙালির ঘরে ঘরে

পেঁচা নানা রকম হয়, তবে সব পেঁচাই লক্ষ্মীর বাহন নয়। ছোট্ট সাদা পেঁচা, যাকে লক্ষ্মীপেঁচা বলা হয়, সেটাই লক্ষ্মীর বাহন।

প্রাচীন মিশরের চিত্রলিপিতেও পেঁচার ব্যবহার ছিল, রোমান হরফে যেটি এম (M) সেটিকেই পেঁচার ছবি দিয়ে প্রকাশ করা হত হায়রোগ্লিফিকে। মিশরে শোক ও দুঃখের প্রতীক ছিল পেঁচা। এখানে একটা তথ্য না দিলেই নয়, তা হল মিশরে সমস্ত চিত্রই দেখা যায় মুখের একপাশের, ব্যতিক্রম কেবল পেঁচা, কারন পেঁচার চোখ থাকে মুখের দু-পাশে। তাই পেঁচার ছবি আঁকার সময় শরীরের অংশ পাশের দিকে ফিরিয়ে আঁকা হলেও মুখটি থাকত সামনে ফিরে।

aboutegypt_102318081603.jpg হায়রোগ্লিফিকে পেঁচা (সৌজন্য: অ্যাবাউটইজিপ্ট.কম)

আমাদের পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী পেঁচা যেমন দেবী লক্ষ্মীর বাহন, তেমন গ্রিক কাহিনি অনুয়ায়ী পেঁচা হল এথেনার প্রতীক। এথেনা অবশ্য লক্ষ্মীর মতো সম্পদের দেবী নন, তিনি সরস্বতীর মতো জ্ঞানের দেবী। পেঁচা অন্ধকারে দেখতে পায়, সেটাই হল দিব্যচক্ষু, সেই অন্ধকারভেদী দৃষ্টিকেই শিক্ষার আলোকের সঙ্গে তুলনা করা যায় যা অন্ধকারেও দিশা দেখায়। তাই পেঁচা হল এথেনার প্রতীক।

তবে রোমানদের বিশ্বাস ছিল পেঁচার ডাক শোনা মানে মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা। জুলিয়াস সিজার থেকে অগাস্টাস... অনেকের মৃত্যুর বার্তাই নাকি বয়ে এনেছিল পেঁচা। ব্যবসায়ীরা যদি পেঁচার দেখা পেতেন তখন হয় তাঁদের জাহাজডুবি ঘটত না হয় তারা পড়ত ডাকাতের খপ্পরে – সোজা কথায় পেঁচা ছিল অযাত্রা।

drachma_102318081629.jpgগ্রিসের প্রাচীন মুদ্রায় পেঁচা

রোমের বণিকরা সমুদ্রযাত্রার সময় পেঁচাকে অযাত্রা মনে করলেও আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা আবার পেঁচাকে জলের দানবের হাত থেকে বাঁচানোর রক্ষাকর্তা বলে মনে করতেন। কোথাও জলের কাছে পেঁচা দেখলে তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যেতেন সেখানে মাছ আছেই। যদিও অ্যাপাচে ইন্ডিয়ানরা পেঁচাকে যমদূতই মনে করতেন।

গ্রিকদের অতিপ্রাচীন টেট্রা দ্রাখমা মুদ্রায় ছিল দেবী এথেনার প্রতীক পেঁচা। গ্রিকরা তাদের অধুনিক মুদ্রাতেও সেই পেঁচার চিহ্ন বহন করেছে এমনকী বর্তমান ১ ইউরোতেও (গ্রিস) সেই পেঁচা এখনও বিরাজমান। গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের নামও তো দেবী এথেনার নামেই।

slovenia-coin_102318081705.jpegস্লোভেনিয়ার মুদ্রায় পেঁচা

  

আমাদের এই বাংলার লোকশিল্পের সঙ্গেও পেঁচা জড়িয়ে। বর্ধমানের নতুনগ্রাম যে দুটি পুতুলের জন্য বিখ্যাত তার একটি হল পেঁচা, যাকে নতুনগ্রামের পেঁচা বলা হয়। নতুনগ্রামের এই কাঠের পেঁচার প্রতীক ব্যবহার করে এখন নানা ধরনের আসবাব তৈরি হচ্ছে।

body2_040118045919_102318081731.jpgনতুনগ্রামের পেঁচা (নিজস্ব চিত্র)

পেঁচার নিয়ে ডাকটিকিটও হয়েছে।

tangelcrafts_102318081918.jpgপেঁচা নিয়ে ডাকটিকিট (সৌজন্য: ট্যাঙ্গেলক্র্যাফটস)

বাংলা সাহিত্যেও পেঁচা রয়েছে। প্রথমেই যেটা মনে আসে তা হল হুতোমপেঁচার নকশা। তারপরে জীবনানন্দ দাশের কবিতা। আর যেটা শিশুকাল থেকে শুনে আসছি সকলে, সুকুমার রায়ের সেই অনবদ্য পংক্তি –

পেঁচা কয় পেঁচানি  খাসা তোর চেঁচানি... আর শেষে সেই অবিস্মরণীয় পংক্তি –

তোর ডাকে পেঁচি রে    সব ভুলে গেছি রে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment