বিনা ইঞ্জিনে ট্রেন ছুটলে যাত্রীদের ধৈর্য্য ধরে বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই
পরিস্থিতি এড়ানোর উপায় একটিই, সুরক্ষা-সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশিকা মেনে কাজ করতে হবে
- Total Shares
জাপানের বুলেট ট্রেন হলে অন্য কথা ছিল। তাও সেখানে একটা ইঞ্জিন থাকে। কিন্তু ট্রেন চলে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু শনিবার রাতে ভারতীয় রেল এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী রইল। ওড়িশার সম্বলপুরে আমেদাবাদ-পুরী এক্সপ্রেসের ২২টি কামরা ইঞ্জিন, গার্ড, চালক, সিগন্যাল ছাড়াই পেরিয়ে গেল প্রায় ১৩ কিলোমিটার পথ। দেখেশুনে মনে হচ্ছিল যেন কোনও ভুতুড়ে সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দৃশ্য।
ঠিক কী হয়েছিল?
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার রাত দশটা নাগাদ। ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে বোলাঙ্গির জেলার তিতলাগড় স্টেশনে। সেখানে তখন আমেদাবাদ-পুরী এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনের অভিমুখ বদলানো হচ্ছিল। ইঞ্জিন বদলের সময়ে রেল কর্মীরা কামরার স্কিডিং ব্রেক ব্যবহার করেননি, যা দিয়ে ট্রেনের কামরার চাকা লক করে দেওয়া হয়।
ইঞ্জিনটি ট্রেনের সামনে থেকে সরিয়ে কোচের উল্টোদিকে জোড়া দেওয়ার সময়ে ইঞ্জিনের আলতো ধাক্কায় কোচগুলি পিছনের দিকে গড়াতে শুরু করে। ট্রেন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে লাইন বেশ খানিকটা ঢালু থাকায় ইঞ্জিনবিহীন ট্রেনেও গতি পেয়ে যায় এবং চাকা লাইনের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলতে শুরু করে। ঢালু লাইন বেয়ে সিগন্যাল ছাড়াই ট্রেন গড়াতে গড়াতে কালাহান্ডি জেলার কেসিঙ্গায় পৌঁছে যায়। সেই সময় রেলের বেশ কয়েকজন কর্মী লাইনে পাথর ফেলে ট্রেন থামান।
সৌভাগ্যবশত, সেই সময় ঐ লাইনের উপর অন্য কোনও ট্রেন ছিল না। একই সঙ্গে বিনা ইঞ্জিনে ট্রেন যে ১৩ কিলোমিটার লাইনের ছুটল, সেখানে কোনও বাঁক ছিল না। এর ফলে, জোর রক্ষা পেয়েছেন ট্রেনের হাজারখানেকের উপর যাত্রী।
দুর্ঘটনার কারণ
ইঞ্জিন বদলের সময়ে দুটি উপায়ের মধ্যে যে কোনও একটি অবলম্বন করতে হয়। এক, প্রথমে ট্রেন থেকে ইঞ্জিন আলাদা করে নেওয়ার আগেই উল্টো প্রান্তে নতুন ইঞ্জিন লাগিয়ে নেওয়া উচিৎ। যদি দুটি ইঞ্জিনের ব্যবস্থা না থাকে (এ ক্ষেত্রে যেমন একটি ইঞ্জিনেকেই সামনে থেকে সরিয়ে পিছনের দিকে জোড়া দেওয়া হচ্ছিল) তা হলে কামরার ব্রেক প্রয়োগ করা ছাড়াও ট্রেনের শেষ কামরার চাকায় বিশেষ ধরণের ব্লক বসানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কর্মীরা তা করেননি।
এক বিশেষজ্ঞের মতে, ‘যে কোনও ট্রেনেই ইঞ্জিন এবং কামরার জন্য দু'টি পৃথক ব্রেক থাকে। এ ক্ষেত্রে কামরার জন্যে ব্যবহৃত এ-৯ ব্রেক প্রয়োগ করা হয়নি। ইঞ্জিন বদলের সময়ে কোচের বাফারে ইঞ্জিনের আলতো ধাক্কাতেই ট্রেন গড়াতে শুরু করে।"
যাত্রীদের কী কর্তব্য
সত্যি কথা বলতে এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের কোনও কিছুই করবার থাকেনা।
ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী পরে জানিয়েছেন যে তাঁরা বারংবার কামরার চেন টানবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছুই হয়নি, অর্থাৎ ট্রেন রোখা যায়নি।
আসলে এই চেন কী ভাবে কাজ করে তা নিয়ে সম্যক কোনও ধারণা নেই যাত্রীদের। চেন টানলেই ট্রেন দাঁড়ায় না। চেন টানলে ইঞ্জিনের চালকের কাছে একটি বার্তা যায়। চালককে তখন বেশ কয়েকটি নিয়ম কানুন মেনে সেই বার্তা অনুসরণ করে ট্রেন থামাতে হয়। সুতরাং, চেন টানলেই ট্রেন নিজে নিজে দাঁড়িয়ে যায় না, তা ইঞ্জিন থাকুক বা নাই থাকুক।
জোর রক্ষা পেয়েছেন ট্রেনের হাজারখানেকের উপর যাত্রী
তাহলে উপায়?
এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের কিছুই করবার নেই, একমাত্র ধৈর্য্য ধরা ছাড়া। ঢাল বেয়ে ইঞ্জিন বিহীন ট্রেন লাইনের যে জায়গায় ফের খাড়াই শুরু হয়েছে সেখানে দিয়ে আটকে যাবে।
রেলকর্মীরা অবশ্য চাকার সামনে পাথর ফেলে ট্রেনের গতিরোধ করে ট্রেন আটকাতে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতার অবলম্বন করতে হবে। ট্রেনের গতি যদি বেশি থাকে তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
রেলকর্মীরা অবশ্য আরও একটি কাজ করতে পারেন। তাহলে এ ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টিই হয় না - সুরক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশিকা মেনে কাজ করা।

