ভারতে তেলের দাম কেন আকাশ ছুঁয়েছে, এবং ছুঁয়ে থাকবে

তাও এমন একটা সময় যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হ্রাস পেয়েছে

 |  4-minute read |   04-04-2018
  • Total Shares

পয়লা এপ্রিল পেট্রলের দাম গত চার বছরে সর্বোচ্চ মাত্রা স্পর্শ করল। রাজধানী দিল্লিতে লিটারপ্রতি পেট্রোলের দাম ছিল ৭৩.৭৩ টাকা আর ডিজেলের দাম ছিল ৬৪.৫৮ টাকা। কলকাতায় পেট্রল ও ডিজেলের দাম ছিল যথাক্রমে ৭৬.৬৯ টাকা ও ৬৭.৫৫ টাকা।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ বার জ্বালানির দাম এই মাত্রায় পৌঁছেছিল। কিন্তু সে সময় গোটা বিশ্বেই জ্বালানির দর অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছিল।

শেষ চার বছরে অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অনেকটাই কমেছে। তা সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রেতাদের স্বস্তি মেলেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতে জ্বালানির দাম কমল না কেন এবং এর জন্য দায়ী কে?

দেশের জটিল কর ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়ের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারগুলোর জ্বালানির উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা ও সর্বোপরি এ দেশে জ্বালানির জন্য বিকল্প শক্তির অভাব - এই তিনটে কারণে ভারতে জ্বালানির দাম সবসময়ই উর্ধ্বমুখী।

শুল্ক

২০১৭ সালের জুন থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত তল সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতার উপর ভিত্তি করে প্রতিদিন জ্বালানির দাম সংশোধন করছে। আগে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর সরকার নিজে জ্বালানির দাম ঠিক করত। তেল বণ্টন পর্যন্ত যে টাকা খরচ হয় এবং যে দামে তেল বিক্রি হয়, এই দুইয়ের ফারাকের (আন্ডার রিকভারি) অঙ্ক সরকার তেল-সংস্থাগুলোকে দিয়ে দেয়। তবে এই অঙ্ক মেটানোর জন্য ঘুরপথে প্রভাব পড়ে রাজকোষের উপরেই।

সরকার এই ক'বছরে যে পদক্ষেপ করেছে তাতে রাজকোষ ঘাটতি কিছুটা কমাতে পারলেও, পেট্রোলিয়ামের দাম অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

ক্রমাগত দাম বাড়তে থাকার জন্য অনেকেই সরাসরি সরকারকে দায়ী করেন। প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়ার মতে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য গরিব দেশগুলোর থেকে ভারতে পেট্রোলের উপর করের পরিমাণ অনেকটাই বেশি, কারণ এ দেশে কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যগুলোও পেট্রোপণ্যের উপরে কর আরোপ করে। 

ইতিমধ্যেই অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে খনিজ তেলের উপর আমদানি শুল্ক ও তেল শোধনাগারগুলোর উপর আবগারি শুল্ক কমানোর আর্জি জানানো হয়েছে, যা করলে স্বাভাবিক ভাবেই জ্বালানির দাম অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু এ বছরের বাজেটে এই দাবি মানা হয়নি, যাকে অনেকেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে মনে করছেন। যতই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বলানির দাম কমুক, সরকারি কোষাগার ভরিয়ে তুলতে ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি অবধি অন্তঃশুল্ক মোট ন'বার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে এই শুল্ক একবারের জন্য কমানো হয়েছিল, লিটারপ্রতি দু'টাকা করে। কিন্তু এ জন্য গত অর্থবর্ষে সরকারের কোষাগারে ২৬,০০০ কোটি টাকা কম এসেছে। এই অর্থবর্ষে আরও ১৩,০০০ কোটি টাকা মতো কম  রাজস্ব আসবে।

কেন্দ্রীয় সরকার এর পরে রাজ্যগুলোকেও আর্জি জানিয়েছিল তারা যেন নিজেদের রাজ্যে ভ্যাটের (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) পরিমাণ কমিয়ে দেয়। শুধুমাত্র চারটি রাজ্য, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও হিমাচলপ্রদেশের সরকার কেন্দ্রের এই প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছিল।

অর্থনীতিবিদ মোহন গুরুস্বামী হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিয়েছেন, "জ্বালানির উপর সরকারের রাজস্ব আদায় অনেকটাই নির্ভর করে। তাই তারা করের হার কোনও মতেই কমাবে না। রাজ্যগুলোর কাছে রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ উৎস হল জ্বালানি ও মদ । এছাড়া আমদানি বাজারের ভারসাম্যহীনতা নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কাও রয়েছে। আর্থিক হিসাবে আমাদের দেশের আমদানির ৬০ শতাংশই খরচ হয় জ্বালানি আমদানি করতে। তেলের উপর শুল্ক যদি হঠাৎ কমিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে স্বাভাবিক নিয়মেই তেলের ব্যবহার বাড়বে, বাড়াতে হবে তেলের আমদানিও। যা কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোকে সমস্যায় ফেলবে।"

body_040418050036.jpgযতই দাম বাড়ুক, দেশে জ্বালানির চাহিদা কিন্তু সর্বদাই প্রবল

প্রবল চাহিদা

যতই দাম বাড়ুক, দেশে জ্বালানির চাহিদা কিন্তু সব সময়ই প্রবল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অ্যালফন্স কোন্নানথানম জানিয়েছিলেন, যাঁরা গাড়ি কিনতে পারেন তাঁরা জ্বালানির খরচও বহন করতে পারবেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা কোনও মতেই ঠিক নয়।

শুধুমাত্র ব্যক্তি মালিকানার গাড়ির মালিকরাই জ্বালানি ব্যবহার করেন না, খাদ্যশস্য থেকে সবজি সব কিছুরই পরিবহণের জন্য জ্বালানির প্রয়োজন রয়েছে। শহরাঞ্চলের বিভিন্ন ছোট-বড় ব্যবসায় জ্বালানি দরকার হয়। বলতে গেলে, জ্বালানি কিন্তু এ দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।

জ্বালানি থেকে বেশি শুল্ক আদায়ের কারণ সেই অর্থ সরকারি প্রকল্প ও দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নের খরচ জোগাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আর হচ্ছে কই? এখনকার ব্যবস্থায় সরকার জ্বলানি থেকে শুল্ক আদায় করে রাজকোষ ভরাচ্ছে আবার সেই টাকাই জ্বালানির পিছনেই খরচ হয়ে যাচ্ছে।

এ সবের মধ্যে ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কোনও বিকল্প উপায় না থাকায় মোটা টাকার বিনিময় জ্বালানি ক্রয় করতে হচ্ছে।

দেশব্যাপী এক জিএসটি

কেন্দ্র ও রাজ্যের শুল্ক কমানোর আরও একটি উপায় রয়েছে, পেট্রল ও ডিজেলের সম হারে জিএসটি বসান। এই প্রস্তাবটিও সম্প্রতি পেশ করা হয়েছে।

বিজনেস টুডে একটি প্রতিবেদনে লিখেছে, "জ্বালানির উপর রাজ্যগুলি যে শুল্ক  আরোপ করে, তা প্রতিটি রাজ্যে সমান নয়। যেমন, মহারাষ্ট্র, যেখানে পেট্রলের উপর ৪০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়, সেখানে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে শুল্কের হার মাত্র ৬ শতাংশ। ডিজেলের উপর শুল্কের হার রাজ্যগুলোতে ৬ শতাংশ থেকে ২৬ শতাংশ অবধি।" এই শুল্কের হার যদি প্রতিটি রাজ্যে এক করে দেওয়া হয়, তাহলে কোনও কোনো রাজ্যে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাবে, আবার কয়েকটি রাজ্য অস্বাভাবিক মাত্রায় রাজস্ব হারাবে।

এদেশে জ্বালানির দাম শুধুমাত্র অর্থনীতির উপর নির্ভর করে না, রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরও ভীষণ ভাবে নির্ভর করে। তাই সাধারণ মানুষের সমস্যা-মুক্তির জন্য আপাতত কোনও পথই খোলা নেই।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

Comment