গৃহপালিত পশুপাখি মানুষের বন্ধু, তাই এদেরও যত্নের প্রয়োজন
বিড়াল থেকে ডিপথেরিয়া হওয়ার ধারণাটা একেবারেই ভুল
- Total Shares
গৃহপালিত জীব নিয়ে আমাদের অনেকেরই কিছু ব্যক্তিগত মতামত রয়েছে। তবে আমার অনেক পরিচিত লোকজন আছেন যাঁরা কুকুর, বিড়াল কিংবা পাখি পোষেন, তাঁদের কাছেই শুনেছি যে তাঁরা তাঁদের পোষা প্রাণীটা ছাড়া জীবন কাটাবার কথা ভাবতেই পারেন না।
যাঁদের বাড়িতে পশুপাখি নেই তাঁরা হয়ত যাঁদের বাড়িতে কুকুর, বিড়াল কিংবা পাখি আছে তাঁদের আবেগটা সম্পূর্ণ বুঝতে পারবেন না। তবে এই কথাটা ঠিক যে এদের পোষার অনেকগুলো ভালো দিক আছে, বিভিন্ন গবেষণাও তেমনটাই বলছে। এরা আমাদের একাকিত্ব ও মানসিক গ্লানি বা অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে। পশুপাখি যেমন আদর ভালোবাসে এবং বোঝে, এরা আদর করতেও জানে। এদের আনুগত্য ও বন্ধুত্ব নিয়ে বিভিন্ন সিনেমায় হয়েছে, বইও লেখা হয়েছে। তাই এরা সঙ্গী বা বন্ধু হিসেবে খুব ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে বিদেশে ডাক্তারা এখন বাড়িতে পশুপাখী পোষার পরামর্শ দেন।
যেসব বাড়িতে বাচ্চা আছে সেখানে যদি কোনও জীব থাকে তাহলে এদের সঙ্গে খেলাধুলার মাধ্যমে বাচাদের মানসিক বিকাশ ঘটে। তাছাড়া এদের সঙ্গে সময় কাটানোর ফলে একটি বাচ্চার মধ্যেও একটা সহজাত আন্তরিকতা ও আনুগত্যের প্রকাশ ঘটে।
এদের নিয়মিত টিকা দেওয়ানো উচিৎ
এই তো গেল পশুপাখি বাড়িতে পোষার কিছু ভালো দিক। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে বাড়িতে পশুপাখি পোষার ফলে বাড়ির সদস্যরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। বেলেঘাটা আইডি অ্যান্ড বিজি হাসপাতালের অধ্যক্ষ উচ্ছ্বলকুমার ভদ্র যেমনটা জানান যে, "আমার ঠিক যেমন ভাবে নিজেদের পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখি ঠিক একই ভাবে গৃহপালিত পশু-পাখিদের সব সময় পরিষ্কার ভাবে রাখতে হয় না হলে তাদের যেমন বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেবে বাড়ির সদস্যদেরও নানা শারীরিক সমস্যাও হতে পারে। কুকুরদের কেনেল বা ঘরটাকে রোজ পরিষ্কার করতে হবে। তাদের যে খাবার দেওয়া হয় সেটাও পরিষ্কার করেই রান্না করতে হবে। এরা যে পাত্রে খায় খাওয়া হয়ে গেলে সেটা ভালো করে মেজে-ধুয়ে রাখতে হবে।"
এদের লোম থেকে শ্বাসকষ্টের মতো বিভিন্ন অন্য রোগও হতে পারে। এদের থেকে নিওমোকোনিয়োসিস (pneumoconiosis) হতে পারে। স্বাসের ভেতরে লোমের টুকরো চলে গিয়ে একটা ফাইব্রোসিস তৈরি করে একেই নিওমোকোনিয়োসিস বলা হয়।
মানুষের দেহে যেমন উকুন থাকে ঠিক তেমন ভাবেই এদের দেহেও উকুন থাকে যার থেকে নানারকম ব্যাকটেরিয়াল বা ভাইরাল রোগ ছড়াতে পারে। আমরা জানি ইঁদুরের গায়ের পোকার থেকে প্লেগ হয়। তাই এদের লোম পরিষ্কার রাখতে হবে সবসময়।
অধ্যক্ষ জানান, "আমরা অনেক সময় দেখেছি যে এদের সঙ্গে অনেকে ও বাচ্চারা মুখে মুখ লাগিয়ে আদর করেছেন। এর ফলে আচমকাই এরা কামড়ে বা আঁচড়ে দিতে পারে। আমার আমাদের হাসপাতালে প্রায় প্রত্যেকদিন এ ধরণের রোগীদের পাই যাঁরা হয়ত কোনও কুকুর কিংবা বেড়ালকে আদর করতে গিয়ে পশুটি তাঁর চোখ কিংবা নাক খুবলে দিয়েছে বা আঁচড়ে দিয়েছে।"
পাখির থেকে প্যারট ফিভার হয়
পশুচিকিৎসক ডা. সুভাষ সরকার বলেন, "কোনও ব্যক্তিকে যদি এরা আঁচড়ে কিংবা কামড়ে দেয় তাহলে দু'ক্ষেত্রেই রেবিসের ইঞ্জেকশন নিতে হবে।" তবে ডা. ভদ্র বলেন কুকুরকে রেবিসের টিকা দেয়া হলেও তারা এর বিরুদ্ধে কতটা সুরক্ষিত হয় সেটা নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সুতরাং যে সব কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে এমন কুকুর যদি মানুষকে কামড়ায় তাহলে কিন্তু আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। তিনি বলেন সাধারণ মানুষের একটা ভুল ধারণা রয়েছে যে বিড়াল থেকে ডিপথেরিয়া রোগটি হয় কিন্তু বিড়াল থেকে আদৌ এই রোগটা হয় না। এটা একটা মিথ বই আর কিছুই নয়।
পশুপাখির থেকে যে সব রোগগুলো মানুষের আসে সেগুলোকে জুনোটিক রোগ (zoonotic diseases) বলা হয়, যেমন রেবিস, শ্বাসকষ্ট, লেপ্টোস্পাইরোসিস (Leptospirosis) কিংবা রিং ওয়ার্মের (চুলকানি) মতো অসুখ।
বিভিন্ন গৃহপালিতের থেকে বিভিন্ন রোগ হতে পারে, যেমন কুকুর ও বিড়াল থেকে হয় রেবিস, আবার শুয়োর থেকে সোয়াইন ফ্লু হয় এবং পাখির থেকে বার্ডফ্লু,প্যারট ফ্লু ও কয়েক ধরণের ফাঙ্গাল ইনফেকশন।
ডা. সরকার বলেন, "আমার কাছে অনেকেই আসেন যাঁদের বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে আবার বাড়িতে কোনও পশু বা পাখিও আছে, তাই তাঁরা জানতে চান তাঁদের বাচ্চার কোনও সমস্যা হতে পারে কী না। আলাদা করে বাচ্চাটির জন্য দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই, কারণ পশু বা পাখিকে পরিষ্কার করে রাখলে ও এদের নিয়মিত টিকা দিলেই চলে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বাচ্চাটি প্রাণীর সঙ্গে মুখে মুখ লাগিয়ে আদর না করে।"
পশুপাখী যেমন আদর ভালোবাসে এবং বোঝে, এরা আদর করতেও জানে
তিনি বলেন, "তবে দেখতে হবে এই প্রাণীটি থাকার ফলে বাচ্চাটির কোনও ধরণের অ্যালার্জি কিংবা স্বাসকষ্ট হচ্ছে কী না। অনেক বাচ্ছাদের অ্যালার্জির প্রবণতা থাকে তখন লক্ষ্য রাখতে হবে প্রাণীটির থেকে অ্যালার্জিটা আরও বাড়ছে কী না। কুকুরের লোমের থেকে অনেকের যেমন ডগ ফার অ্যালার্জি হওয়ার প্রবণতা থাকে।
ড. সরকার বলেন, "অনেক সময় দেখি বাড়ির কুকুর কিংবা বিড়ালকে নিয়ে এক বিছানায় শুচ্ছেন অনেকেই তবে আমি বলব এই ধরণের অভ্যাস না করাই ভালো। এদেরকে নিজেদের একটা নির্দিষ্ট স্থানেই শোয়ার অভ্যাস করানো উচিৎ।"
যাঁরা বাড়িতে কোনও পশুপাখি পোষেন তাঁদের অবশ্যিই মনে রাখতে হবে এদের যেন নিয়মিত টিকা দেওয়ানো হয় এবং নির্বীর্যন বা স্টেরিলাইজেশান করা হয়।

