শুধু অফিস টাইমে বেসরকারি বাস: প্রতিবাদের পদ্ধতি অভিনব কিন্তু বাস্তবসম্মত নয়
ঘোষণা করা আর ঘোষণা কার্যকর করা, বাস সংগঠনগুলোর এই দুইয়ের স্ট্রাইক রেট খুবই খারাপ
- Total Shares
সিদ্ধান্তটা অভিনব। ঠিক ধর্মঘট নয়, কিন্তু ঘুরপথে ধর্মঘট তো বটেই।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাস মালিকেরা নাকি আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছে। একটু ভুল বলা হল। মূলবৃদ্ধির ফলে বাস মালিকেরা সত্যি সত্যিই আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকার আবার 'জন দরদী'। তৃণমূলের শ্রমিক ইউনিয়ন নিজেদের ইচ্ছে মতো, খেয়াল খুশি মতো অটো ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু তৃণমূল সরকার কোনও মতেই বাস ভাড়া বৃদ্ধি করবে না। পুজোর মুখে ট্যাক্সি ভাড়াও বৃদ্ধি করতে পারে রাজ্য সরকার। কিন্তু বাস তো আম জনতার সওয়ারী। লোক নির্বাচনের মাস কয়েক আগে বাস ভাড়া বৃদ্ধির করে সরকার কেন খামোখা ঝুঁকি নিতে যাবে।
প্রতিবাদ ছাড়া আর উপায় নেই। আর এ বাংলায় প্রতিবাদ মানেই তো ধর্মঘট। বেসরকারি বাস মিনিবাস ও ট্যাক্সি সংগঠনগুলোর ধর্মঘট ঘোষণার রেকর্ড দেখলে স্বয়ং বিরাট কোহলিও লজ্জা পেয়ে যাবেন। তবে স্ট্রাইক রেটে কিন্তু সমস্যা রয়েছে। মানে ধর্মঘট ঘোষণা করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ঘটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে ব্যর্থ হন এই সংগঠনগুলো।
এবার তাদের ঝুলি থেকে বেরিয়েছে এক অভিনব পন্থার বাস ধর্মঘট। সোমবার থেকে বুধবার ধর্মঘট ডেকেছেন বাস মালিকরা। ধর্মঘট ডাকা মানেই স্বভাবতই যে প্রশ্নটি আসে তা হল ক'ঘণ্টার জন্য ধর্মঘট? এখানে উল্টো প্রশ্ন করতে হবে। মানে ওই তিনদিন ক'ঘণ্টার জন্য বেসরকারি বাস পাওয়া যাবে?
কারণ সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে শুধুমাত্র অফিস টাইম ও স্কুল টাইমে বাস চলবে। আরও নির্দিষ্ঠ ভাবে বলতে গেলে সকাল ৮টা থেকে ১১টা এবং বিকেল ৩টে থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বাস চলবে।
অসাধারণ যুক্তি।
প্রতিবাদ অভিনব কিন্তু বাস্তবসম্মত নয় [ছবি: পিটিআই]
তা, ঘড়ি ধরে সকাল ১১টার সময় ও সন্ধ্যে ৭টার বাস বন্ধ করে দেওয়ার ব্লুপ্রিন্টটা ঠিক কী? ধরুন ৩সি/১ রুটের একটি বাস ১০টা নাগাদ রুবি থেকে বেরিয়েছে এবং ঘণ্টাখানেক বাদে ধর্মতলা পৌঁছিয়েছে। প্রতিবাদের ধরণ অনুযায়ী বেলা ১১টে থেকে বাস আর চলবে না। তাহলে কি বাসটি ধর্মতলায় দাঁড়িয়ে পড়বে এবং আবার বেলা তিনটের সময়ে ওই ধর্মতলা থেকেই যাত্রা শুরু করবে?
এই পদ্ধতিতে যদি শহরের বিভিন্ন প্রান্তে শ'য়ে শ'য়ে বাস দাঁড়িয়ে পরে তাহলে ট্রাফিক পুলিশ কি বিষয়টি মেনে নেবে? সকালে এক ট্রাফিক কর্তাকে এই প্রশ্নটি করতেই তিনি তো হেসেই কুটোপাটি। বললেন, "যারা ঘোষণা করেছেন তাঁদের জিজ্ঞেস করুন।"
বাস সংগঠনকে ফোনে ধরার আগে ভাবলাম এই পদ্ধতিটা অবাস্তব। কিন্তু আর কোনও 'বাস্তব' পদ্ধতি রয়েছে কী? বাস্তব পদ্ধতির খোঁজও পেলাম। মাঝ রাস্তায় বাস দাঁড়িয়ে পড়লে ট্রাফিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু গন্তব্যে পৌছিয়ে গিয়ে যদি দাঁড়ায় তাহলে তো ক্ষতি নেই। ৩সি/১ এর এক কন্ডাকটর জানালেন যে রুবি থেকে নাগেরবাজার (ওই বাসের রুট) পৌঁছাতে তাদের কমপক্ষে ঘণ্টা তিনেক লাগে। তার মানে সকাল ১১টায় ও সন্ধ্যে ৭টায় বাস বন্ধ করতে হলে শেষ বাসটি স্ট্যান্ড থেকে যথাক্রমে সকাল ৮টায় এবং বিকেল চারটেতে বেরোবে।
একটা কথা মাথায় রাখতে হবে। শহরের অধিকাংশ বাস রুটেরই গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগে কমপক্ষে ঘণ্টা দু'য়েক। তার মানে তো অধিকাংশ বাস রুটেই সকাল ন'টার মধ্যে শেষ বাসটি বেরোবে। আর দিনের শেষ বাসটা বিকেল পাঁচটার মধ্যে বেরোবে।
এই পদ্ধতিটাও কী রকম অবাস্তব শোনাচ্ছে না?
এবার বাস সংগঠনের দুই নেতাকে ফোনে ধরা গেল। এদের মধ্যে একজন প্রশ্ন শুনে বললেন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করুন। সেই 'অন্যজন' খানিকটা ক্ষিপ্ত হয়ে জবাব দিলেন, "সোমবারেই আমাদের ব্লুপ্রিন্ট দেখতে পাবেন।"
আদৌ কি কোনও ব্লুপ্রিন্ট রয়েছে? প্রতিবাদের পদ্ধতিটাই যেখানে বাস্তবসম্মত নয় সেখানে আর বাস্তবসম্মত ব্লুপ্রিন্ট থাকে কী করে?
অতঃপর? ওই যে বললাম না, বাস সংগঠনদের কাছে ঘোষণা আর ঘোষনা কার্যকর করা এই দু'য়ের স্ট্রাইক রেটটা খুবই খারাপ।

