তীব্র আবেগ ও উষ্ণতা দিয়ে বিশ্ববাসীর হৃদয় জিতে নিলেন কোলিন্দা গ্রেবার কিতারোভিচ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা ক্রোটরা যে হৃদয়ের সৌন্দর্যেও সমৃদ্ধ তা মনে করালেন প্রেসিডেন্ট

 |  3-minute read |   16-07-2018
  • Total Shares

বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার জন্য টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছিলেন ভারতবাসী। ফাইনাল শেষ হওয়ার পরমুহূর্তেই যে দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠল তা নীতিবাগিশ ভারতবাসীর হৃদয়ে ছোটখাট ভূমিকম্প তৈরি করেছিল। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাকরোঁ চুম্বন এঁকে দিলেন ক্রোয়েশিয়ার মহিলা প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রেবার কিতারোভিচের গালে।

আমাদের ভূ-ভারতে এর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবশ্য, ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক দূরত্ব যতটা ততটাই দূরত্ব আমাদের দেশের সঙ্গে ওই দুই দেশের সামাজিক রীতিনীতিরও।

body_071618064900.jpgবিশ্বকাপের সেরা মুহূর্ত বোধয়হয় অঝোর বৃষ্টিতে ছাতাহীন কিটারোভিচ একের পর এক ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়দের আলিঙ্গন করে চলেছেন

তারপরে আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম তুমুল বৃষ্টির মধ্যে মস্কোর বিশ্বফুটবল যুদ্ধের মঞ্চে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কিতারোভিচ। তাঁর পরণে দেশের জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি। বৃষ্টির কণায় এলোমেলো চুল মুখে স্নিগ্ধ হাসি।তাঁর পাশেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের মাথায় ছাতা। ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তাঁরা একটা ছাতা জোগাড় করেছিলেন বটে, কিন্তু সেদিকে ফিরেও তাকাননি প্রেসিডেন্ট। 

বিশ্বকাপের সেরা মুহূর্ত বোধ হয় অঝোর বৃষ্টিতে ছাতাহীন কিতারোভিচ। ক্রোয়েশিয়ার একের পর এক খেলোয়াড়কে আলিঙ্গন করে চলেছেন। তবে এই দৃশ্যেও ছিল না আমরা-তোমরা। একই ভাবেই তিনি আলিঙ্গন করেছেন বিজয়ী ফরাসি খেলোয়াড়দেরও। এই দৃশ্যের মধ্যে ছিল তীব্র আবেগ এবং উষ্ণতা। বোধহয় রাজনীতি নয়, শুধুই খেলা - এই স্লোগানের সেরা পিকচার পোস্টকার্ড।

আমরা অবশ্য এই দৃশ্যের সঙ্গে একেবারেই পরিচিত নই। ১৯৮৩ সালে কপিলদেবের নেতৃত্বে ভারত যখন ক্রিকেটের বিশ্বকাপ জিতেছিল তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিজয়ী ভারতীয় দলকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। তবে সে সবই রাষ্ট্রপতি ভবনে এক গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠানে।

২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে মডারেট কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে নির্বাচনে জিতে ক্রোয়েশিয়ার প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কিতারোভিচ। তারপর থেকেই তাঁর প্রধান লক্ষ্য দেশের দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা ফেরানো।

body1_071618064933.jpg তাঁর পরণে দেশের জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি, বৃষ্টির কণায় এলোমেলো চুল, মুখে স্নিগ্দ্ধ হাসি

এবার বিশ্বকাপে দেশের একটি খেলা দেখাও তাঁর বাদ যায়নি। ক্রোয়েশিয়ার প্রতিটি ম্যাচেই স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকেছেন, মিশে গিয়েছেন দেশের সমর্থকদের সঙ্গে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যে ভালো নয় তা তাঁর চেয়ে ভালো আর কে জানে? তাই প্রতিটি খেলাই তিনি দেখতে গিয়েছেন ইকোনমি ক্লাসে।

শুধুমাত্র ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচটা তাঁর দেখা হয়নি। কারণ, সেই দিন তিনি ন্যাটোর সম্মেলনে যোগ দিতে ব্রাসেলসে গিয়েছিলেন। অথচ সেদিনই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁর একটি ছবি নিয়ে তোলপাড় চলে। সেই ছবিতে দেখা যায় ইংল্যান্ডকে পরাজিত করার পরে স্বল্পবেশে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলারদের আলিঙ্গন করে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন কিতারোভিচ । পরে জানা যায় সে ছবিটি আসলে ক্রোয়েশিয়ার এক মডেলের, যিনি পেশাগত কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন। সেই মডেলের সঙ্গে কিটারোভিচের মুখের অসম্ভব মিল রয়েছে। আর, এই সাদৃশ্যের কারণেই যত গোলমাল। তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী উদারবাদী ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট। সংবাদ মাধ্যম ভুল স্বীকার করে নিতেই তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন।

body2_071618065133.jpg৮৩র বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলকে ইন্দিরা গান্ধীও অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, তবে রাষ্ট্রপতি ভবনে এক গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠানে

১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীন হওয়ার পর থেকে চার বছর গৃহযুদ্ধে দীর্ণ হয়েছিল। সেই সময় প্রায় একটা গোটা দশক একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অধীনে ছিল ক্রোয়েশিয়া। ২০০৩ সাল থেকে ক্রোয়েশিয়া এই বেদনাময় অতীত ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে লড়াই শুরু করেছে ক্রোয়েশিয়া। এই লক্ষ্যে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হয়েছে। এর পিছনেও তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী কিতারোভিচের অবদান রয়েছে।

পৃথিবী যে এক নতুন ক্রোয়েশিয়াকে দেখতে চলেছে, তা বোধহয় বিশ্বফুটবলের মঞ্চে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন কিতারোভিচ। অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ক্রোয়েশিয়ার সন্তানরাও যে হৃদয়ের সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ তা মনে করিয়ে দিলেন তিনি।

রাজনীতি, ভিভিআইপি সুলভ গাম্ভীর্য, প্রেসিডেন্ট সুলভ বিশিষ্টতা সরিয়ে রেখে আমজনতার হৃদয়ে জায়গা করে নিলেন কিতারোভিচ। তাই বিশ্বফুটবলের যুদ্ধে জয়ী ফ্রান্স, হৃদয় জিতে নিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। 'গেম অফ থ্রোন' ধারাবাহিকের কল্যাণে ক্রোয়েশিয়ার প্রাচীর ঘেরা সুপ্রাচীন নগরী জাগ্রেবের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। এবার কিতারোভিচের কল্যাণে গোটা ক্রোয়েশিয়াটাই আমাদের মনের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment