জীবদ্দশায় বিশ্ব ফুটবলে ভারতকে দেখা দূর অস্ত্, তাই ঝগড়া ব্রাজিল-আর্জেন্তিনা নিয়ে

ভারতীয় ফুটবলে যদি একজন জগমোহন ডালমিয়া, নিদেনপক্ষে ললিত মোদী থাকতেন!

 |  6-minute read |   29-06-2018
  • Total Shares

কলকাতার এক অভিজাত পাবে বসে দুই তরুণ বন্ধুর কথোপকথন।

-আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ডের খেলাটা দেখলি?- হ্যাঁ। মেসির কী অবস্থা বলত?- সত্যি, শুধুমাত্র ম্যান মার্কিংয়ে আটকে গেল ছেলেটা। -ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং যদি ভাঙতে না পারে তা হলে আর ফুটবলের ভগবান কিসের?- ঠিকই বলেছিস। দূর, কোনও ক্লাসই নয়।

পাশের টেবিলে বসা এক বয়স্ক লোক অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করছিলেন দুই বন্ধুকে। চোখাচোখি হতেই দু'জনকে লক্ষ করে স্মিত হাসলেন। এ বার বিড়ম্বনায় পড়ার পালা বন্ধুদ্বয়ের। কতকটা লজ্জা, কতকটা ভয় আর সর্বোপরি হীনমন্যতায় ভুগে তাঁদের ফুটবল বিশ্লেষণ বন্ধ করলেন দুই বন্ধু। নিজেদের অজান্তেই সিদ্ধান্ত নিলেন ফুটবল নিয়ে আলোচনা আর নয়।

অতঃপর।

এর পর আর কী? বিশ্বকাপ ফুটবল ছেড়ে ভারত আয়ারল্যান্ড টি-২০ ম্যাচ নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন যুগল। আর, ক্রিকেট নিয়ে বিশ্লেষণে তাঁরা যেন ঢের বেশি স্বচ্ছন্দ্য। ঢের বেশি আত্মবিশ্বাসী। হীনমন্যতা বোধের কোনও অবকাশই যেন নেই।

body4_062918045847.jpg

body3_062918045859.jpg ট্রামে, বাসে, মাছের বাজারে, পার্ক স্ট্রিটের অভিজাত রেস্তোরাঁয় বা পাড়ার নান্টুদার চায়ের দোকানে শুরু হয়ে যায় বিশ্বসেরাদের খেলার কাটাছেঁড়া

ঘটনাটি কাল্পনিক। কিন্তু ঘোর বাস্তব থেকে এই ঘটনার অবস্থান খুব বেশি দূরে নয়। প্রতি চার বছর অন্তর ফুটবল বিশ্বকাপ আসে। আর ভারতীয়রা নিজেদের অজান্তেই হয়ে ওঠেন ফুটবল বিশ্লেষক। ট্রামে, বাসে, মাছের বাজারে, পার্ক স্ট্রিটের অভিজাত রেস্তোরাঁয় বা পাড়ার নান্টুদার চায়ের দোকানে শুরু হয়ে যায় বিশ্বসেরাদের খেলার কাটাছেঁড়া। ভারতীয়রা আর ভারতীয় থাকে না। তারা তখন ব্রাজিল বা আর্জেন্তিনা, কিংবা জার্মানি বা পর্তুগালের সমর্থক। বাইচুং ভুটিয়া কিংবা সুনীল ছেত্রী নয়, তাদের শয়নে স্বপনে জাগরণে তখন মেসি, নেইমার বা ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্দোরা।

কিন্তু কেন? এ কি শুধুই ভালো ফুটবল বা ভালো ফুটবলারদের প্রতি নিজেদের ভালোবাসা উগরে দিতে? নাকি, ভারতীয়দের এই আচরণ ওই দুই বন্ধুর মতো হীনমন্যতায় ভুগতে থাকার বহিঃপ্রকাশ? 'ভারত এ বারেও নেই, আমাদের জীবদ্দশাতেও বিশ্বকাপে থাকবে না' - এই সিন্ড্রোমেই কি ভোগেন ভারতের আবালবৃদ্ধবণিতা?

আমরা যারা আশির দশকে জন্মেছি তাদের মধ্যে গগনের দিয়েগো মারাদোনাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। বহু কষ্টে স্মৃতি হাতড়িয়ে ১৯৯০ সালে ইতালিতে 'বার্লিন প্রাচীর' হয়ে ওঠা লোথার ম্যাথিউস ও রুডি ফোলারের কথা মনে পড়ে। বরঞ্চ ১৯৯৪ সালের মার্কিন মুলুকে বিশ্বকাপের স্মৃতি তার তুলনায় অনেকটাই তরতাজা। রোমারিও, দুঙ্গা, বেবেতো, রাই-সমৃদ্ধ ব্রাজিল দল। বিশ্বকাপে ফাইনালের টাইব্রেকারে ঝুঁটি বাধা রবার্তো বাজ্জোর শেষ শটটি তেকাঠির মাথার উপর দিয়ে দর্শকাসনে ছিটকে পড়েছিল - তা এখনও ছবির মতো চোখের সামনে ভাসে। আর, ১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদানের ঘরের মাঠে 'ফরাসি বিপ্লব' তো মনের চিলেকোঠায় সারা জীবন জায়গা করে রাখবে।

কিন্তু, এই সুখস্মৃতিগুলোর মধ্যেই দুঃখ বারবার মনকে নাড়া দিয়ে গেছে। পৃথিবীর ছবি আঁকা সবুজ রঙের পতাকা হাতে পাড়া জুড়ে যতই বিজয় মিছিল করি না কেন, তেরঙ্গা হাতের বিজয় মিছিলের সুখ তাতে নেই। বিজয় মিছিল তো দূর অস্ত্, বিশ্বকাপ ফুটবলে তেরঙ্গার তো কোনও অধিকারই নেই। আসলে ব্রাজিলের পতাকা হাতে এই বিজয় মিছিলও তো সেই হীনমন্যতার ফসল। নিজেদেরটা নেই, পছন্দ মতো পরেরটা বেছে নিয়ে কোনও মতে জীবনযুদ্ধের সান্ত্বনার খোঁজার বৃথা চেষ্টা।

body1_062918050057.jpgগ্রেস হবসের সাধের লর্ডসের ব্যালকনিতে ভারত অধিনায়ক খালি গায়ে জামা ওড়ালেন

কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের কথা বলছিলাম। তার আট বছর আগে নেহেরু কাপের আসর বসেছিল দিল্লিতে, ১৯৮২ সালে। রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানস ভট্টাচার্য্যের গোলে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ম্যাচ ড্র করেছিল ভারত। ৩৫ বছর বাদে সেই দক্ষিণ কোরিয়াই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ান জার্মানিকে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচে হারাল। আর, সুনীল ছেত্রী বা মেহতাব হোসেনরা তখন কয়েক হাজার মাইল দূরে বসে টিভির পর্দায় বা সংবাদপত্রের পাতায় মেসির পেনাল্টি মিস বা নেইমারের বারবার আছাড় খাওয়ার রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত।

এর পরেও ভারতীয় ফুটবল ভক্তদের মধ্যে হীনমন্যতা আসবে না কেন? নিজেরটা ছেড়ে পরেরটা ধরে আঁকড়ে থাকার প্রবণতার জন্ম নেওয়াটাই তো স্বাভাবিক।

ফুটবলারদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমি খুব একটা ফুটবলের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বুঝি না। কিন্তু যখনই ভারতের ফুটবল ব্যর্থতা নিয়ে কোনও ফুটবলার বা প্রশিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনটে বিষয় উঠে এসেছে। এক, শারীরিক গঠনের সমস্যা। বর্তমানে বেশিরভাগ ফুটবলাররা নাকি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসছে আর তাই তাঁদের খাদ্য তালিকায় পুষ্টির অভাব রয়েছে। বিশ্ব পর্যায় বা এশীয় মহাদেশের অন্যান্য ফুটবলারদের শারীরিক গঠনের সঙ্গে তাঁরা যুঝে উঠবেন কী ভাবে? দুই, উপযুক্ত ফুটবল পরিকাঠামোর অভাব। দেশে নাকি ভালো মানের অ্যাকাদেমি ও প্রশিক্ষক নেই যাঁরা নিদেনপক্ষে সৌদি আরবের ওসামা হাওসাইয়ের মতো ফুটবলার তৈরি করতে পারবেন। তিন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর্থিক সমস্যা। তৃতীয় সমস্যা দূর করতে পারলেই নাকি প্রথম দু’টি সমস্যা সমাধানের রাস্তা বেরিয়ে পড়বে।

কিন্তু সমস্যা দূর করা যাচ্ছে কেন? দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা বহু বছর ভারতীয় ফুটবল সংস্থার দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে যিনি রয়েছেন তিনি আবার দেশের অন্যতম ধনী রাজনৈতিক নেতা। প্রথমজন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। দ্বিতীয় জন প্রফুল্ল প্যাটেল। কিন্তু জগমোহন ডালমিয়া ক্রিকেটের জন্য যা করেছেন তার সিকি ভাগও এঁরা কেউ ফুটবলের জন্য করতে পারলেন না।

'অন্ধ' ফুটবল ভক্তরা ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনায় বিরক্ত হতেই পারেন। তবে বিরক্ত হয়ে কোনও লাভ হবে না। ভারতীয় ক্রিকেটের অর্থের প্রধান সূত্র তো ক্রিকেটকে ঘিরে উন্মাদনার জন্যই, যাকে গণ হিস্টিরিয়া বললেও কম বলা হয়। আর এই গণ হিস্টিরিয়ার অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্যে। ক্রিকেটপাগল ভারতীয় তেরঙ্গা হাতে বিজয় মিছিল করতে পারে। অন্য দেশের পতাকা নিয়ে তাদের দুঃখ ভুলতে হয় না।

আসলে ক্রিকেট ঘিরে যেমন ব্যানজিকরণ হয়েছে তেমনই পরিকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে।

১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের কথায় আসা যাক। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শেষ বলে হার দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল গোটা দেশ। এর ১৯৯৬ সালের সেমিফাইনাল। ইডেনে সেদিন দর্শক উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য ম্যাচ শেষ করা যায়নি। ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। কিন্তু সেই ক্ষোভের পিছনে হীনমন্যতা ছিল না। ছিল দুঃখ, বেদনা না পারার যন্ত্রণা। 'আমরাও পারতাম, পারার যোগ্যতা আমাদেরও ছিল কিন্তু তীরে এসে তরী ডুবল' – এই কারণে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই এক যন্ত্রণা, দুঃখ ও বেদনা লক্ষ করা যেত যখন আজহারের ভারত বিদেশে থেকে সিরিজ হেরে ফিরত।

body2_062918050157.jpgণ হিস্টিরিয়ার অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্যে

নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে এই চিত্র বদলাতে শুরু করল। সৌরভের ভারত বিদেশে জয় পেতে শুরু করল, টানা আটটা ম্যাচ জিতে ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল, গ্রেস হবসের সাধের লর্ডসের ব্যালকনিতে ভারত অধিনায়ক খালি গায়ে জামা ওড়ালেন। সব মিলিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে জাঁকিয়ে বসল ভারত। আর ২০১১ সালে তো ফের আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। অন্যের নয়, নিজেদের তেরঙ্গা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় বিজয় মিছিল।

বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতীয় ক্রিকেটের এই কর্তৃত্ব অবশ্য রাতারাতি আসেনি। সৌরভ-ধোনি বা কোহলি যত ভালোই অধিনায়ক হোন না কেন, তাঁদের সাফল্যের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স তো রিজার্ভ বেঞ্চ। সঠিক পরিকাঠামোর ও ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন নতুন প্রতিভার উঠে আসা। সাপ্লাই লাইনটা ঠিক রাখতে পারা। ফুটবল ময়দানে কান পাতলেই একটা কথা শুনতে পাবেন - 'ভারতীয়দের ব্রাত্য রেখে বিদেশিদের বেশি সুযোগ দেওয়া হচ্ছে'।

আইপিএলে তো এত বিদেশি খেলেন। তাতে ভারতীয় ক্রিকেটারদের জৌলুস কমছে না তো। বরঞ্চ বাড়ছে। বিশ্বের তাবড় তাবড় ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলে নিজেদের তৈরি করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন ভারতীয়রা। শুধুমাত্র বিরাট কোহলিরা নন, শুভম গিলদের মতো পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটাররা, ভবিষ্যতে যাঁরা ভারতবাসীকে তেরঙ্গা হাতে বিজয় মিছিলের স্বপ্ন দেখাবেন।

কিন্তু ভারতের ফুটবলে ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে? উত্তর জানা নেই। এখনও অবধি শুধুমাত্র ১৯৮২ সালের নেহেরু কাপের মতো অতীত ঘেঁটেই খুশি থাকতে হবে দেশের ফুটবল সমর্থকদের। না হলে রোনাল্ডো, মেসি, নেইমাররা তো রয়েছেনই। কখনও বার্সিলোনা বা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড আবার কখনও ব্রাজিল বা আর্জেন্তিনার হয়ে গলা ফাটাবেন হীনমন্যতায় ভোগা এদেশের ফুটবল ভক্তরা।

ইস! ভারতের ফুটবল আকাশেও যদি একজন জগমোহন ডালমিয়া, নিদেনপক্ষে একজন ললিত মোদী থাকতেন!

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment