উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব থাকলে, হাজারও আইন করেও ভেজাল রোখা যাবে না
কলকাতা পুরসভার মতো ছোট ছোট পুরসভাগুলোর নিজস্ব কোনও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ দপ্তর নেই
- Total Shares
ভাগাড় কাণ্ডের জেরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে গোটা বাংলা জুড়েই। বিভিন্ন পুরসভা, পুলিশ প্রশাসন ও সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকরা পরিস্থিতির উপর সদা নজর রেখে চলেছেন। প্রয়োজনে মাঠে নেমে রীতিমতো তদন্ত করে চলেছেন।
কিন্তু এই তদন্ত ব্যবস্থা তো সাময়িক। কতদিনই বা চলবে? মেরে কেটে এক সপ্তাহ বা এক মাস। তারপর কী হবে? খাবারে ভেজাল আটকানো কী পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করা যাবে? অন্তত, ভেজাল আটকানোর এই প্রচেষ্টা কি সারা বছর ধরে সম্ভব? উত্তর একটাই, না।
প্রথমেই কলকাতা পুরসভার কথায় আসা যাক। পুরসভার যে দপ্তর শহরের হাজার হাজার হোটেল, রেস্তোরাঁ বা রাস্তার পাশের দোকানে হানা দিয়ে খাবারের মান যাচাইয়ে করে সেই দপ্তরের কর্মী সংখ্যা মাত্র ১৩, তবে পদ রয়েছে ৩২টি। কিন্তু সরকারি নিয়মের জাঁতাকলে এখনই যে দফতরের শূন্যপদ পূরণ সম্ভব নয়। তার মানে, কলকাতার রেস্তোরাঁগুলো বা রাস্তার হোটেল বা ফুটপাথের খাবার দোকানগুলোতে আপনি ভাগাড়ের মাংস খাচ্ছেন কিনা তা জানতে আপনাকে মাত্র ১৩ জন আধিকারিকের উপর ভরসা রাখতে হবে।
রাজ্যের ছোট ছোট পুরসভাগুলোর অবস্থা তো আরও খারাপ। কলকাতা পুরসভার মতো এই পুরসভাগুলোর নিজস্ব কোনও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ দপ্তর নেই। তাই বলে হাওড়া, ব্যারাকপুর, বারাসত, চন্দননগর বা মধ্যমগ্রামে রেস্তোরাঁর সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। কলকাতার শহরতলিতেও রেস্তোরাঁর ব্যবসা খুব রমরমা। ভাগাড়কাণ্ড সামনে আসার পর এই পুরসভাগুলোও বেশ কয়েকটি অভিযান করেছে। অভিযানের ফলে কিছু ধরপাকড়ও হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের মুষ্টিমেয় আধিকারিক এই অভিযানগুলি চালিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই ধরণের তদন্ত বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে করতে হয়েছে। তাঁদের অন্য বিভিন্ন ধরণের কাজও রয়েছে। তাই পাকাপাকি ভাবে তাঁরা ক'দিন এই 'বাড়তি দায়িত্ব' নিয়ে তদন্ত চালাতে পারবেন সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
কিন্তু যদি অভিযান চালিয়ে নমুনা সংগ্রহের পরিকাঠামোই না থাকে, তাহলে হাজারও আইন থেকে লাভটা কী?
এই দোকানে দোকানে পরিদর্শন তো এই ধরণের তদন্তের প্রাথমিক ধাপ। এর পর সন্দেহ জাগলে নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষাগারে পাঠাতে হবে। তার পর পরীক্ষাগারের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে অভিযুক্ত দোকানদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। উত্তর ২৪ পরগনার একটি পুরসভার অভিজ্ঞতা বেশ শোচনীয়। স্বয়ং পুরসভার চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি দল অঞ্চলের একটি বিরিয়ানির দোকানে হানা দিয়েছিলেন। দোকানে কয়েক কেজি পচা মুরগির মাংস আধিকারিকদের চোখে পড়ে। এ ছাড়া কেজি কেজি ভাজা পেঁয়াজও উদ্ধার করেন আধিকারিকরা যার চেহারা এবং রং আঁতকে ওঠেন তাঁরা। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। বিশেষজ্ঞ অফিসার ছিল না বলে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। শুধুমাত্র, ভেজাল খাবার বাজেয়াপ্ত করে দোকানদারকে সতর্ক করেই ছেড়ে দিতে হয়।
রাজ্য সরকারেরও স্বাস্থ্য দফতরের নিজস্ব ফুড সেফটি ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। কিন্তু সেই দপ্তরেও পর্যাপ্ত লোকের অভাব। তাই ইচ্ছে থাকলেও তাঁরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গোটা রাজ্য জুড়ে অভিযান চালাতে পারেন না।
কলকাতা পুরসভার মেয়র পরিষদ (স্বাস্থ্য) অতীন ঘোষ অবশ্য নতুন আইন প্রণয়ন করে এই সমস্যার সুরাহার কথা বলছেন। এটা ঠিক, অন্যান্য রাজ্যগুলোতে থাকলেও এই রাজ্যে এই মূহুর্তে এই সংক্রান্ত কোনও পুরসভা বিধি নেই। কিন্তু তাতেও কি লাভের লাভ কিছু হবে?
সমস্যা তো শিকড়েই রয়ে গিয়েছে। বর্তমানে কোনও পুরসভা যদি কোনও দোকানের নমুনার বিরুদ্ধে নেতিবাচক রিপোর্ট পান তাহলে তাঁরা পুলিশে মামলা রুজু করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পুলিশ ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত দোকানদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
কিন্তু যদি অভিযান চালিয়ে নমুনা সংগ্রহের পরিকাঠামোই না থাকে, তাহলে হাজারও আইন থেকে লাভটা কী?
তাহলে খাদ্য রসিকরা কী করবেন? খুব সচেতন ভাবে রেস্তোরাঁ পছন্দ করুন। খাবার সময় চোখ কান খোলা রাখবেন।

