ধর্মঘটের দিনগুলোতে বাঙালি আর ছুটির আমেজে অলস দুপুর কাটায় না

অর্থনৈতিক ছাড়া রাজনৈতিক কারণও রয়েছে, দিদির বাংলায় তৃণমূল ধর্মঘট ডাকে না

 |  3-minute read |   11-09-2018
  • Total Shares

ভর সন্ধ্যেবেলা প্রস্তুতি তুঙ্গে। আগামীকাল 'বড়' ম্যাচ। পাশের পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা আসছে এই পাড়ায় খেলতে। শেষ মুহূর্তে একবার দেখে নেওয়া হচ্ছে যে সব ব্যবস্থা ঠিকঠাক রয়েছে কিনা। যারা খেলবে তাদের মধ্যে আলাদা উত্তেজনা। প্রায় প্রতি রবিবারই এই ধরণের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু আগামীকালের ব্যাপারটা আলাদা। একটি রাজনৈতিক দল দুম করে বনধ ঘোষণা করে দেওয়ায় পরে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো মঙ্গলবার ছুটি পাওয়া গেছে। সবচাইতে বড় ব্যাপার, ম্যাচটি পাড়ার মাঠে হবে না। হবে বড় রাস্তার উপর।

আশির বা নব্বইয়ের দশকে যারা কলকাতায় কাটিয়েছে তাদের বিলক্ষন বন্ধের দিনগুলোর কথা মনে থাকবে। বাঙালি মাত্রেই বনধ মানে হটাৎ করে বরাত জোরে পাওয়া একটি অলস দিন। কচিকাচারা বা পাড়ার যুব সম্প্রদায় রাস্তায় খেলেই সময় কাটিয়ে দেয়। বাড়ির বড়রা বনধের দিনগুলোতে এক হয় ল্যাদ খেয়ে সময় কাটিয়ে দেন নয়ত চায়ের দোকানে জমিয়ে আড্ডা মেরে।

রাজনৈতিক নেতাদের সৌজন্যে দিনটা যদি সোম মঙ্গলবার না হয়ে, শুক্রুবার হয় তাহলে তো কথাই নেই। পরিবার নিয়ে কাছে পিঠে ঘুরে আসা। যাকে বলে উইকেন্ড ভ্রমণ। সব মিলিয়ে, আশির বা নব্বইয়ের দশকে বাঙালি মাত্রেই বনধের দিনে রবিবারের ছুটির মজাটা নিয়ে নেওয়া।

তবে এই 'ছুটি' নিয়ে সমালোচনা করা যাবে না। বুদ্ধিজীবী খ্যাত বাঙালিদের দোহাই তৈরি রয়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যদি পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে তাহলে কে দেখবে? অর্থাৎ, নিরাপত্তাজনিত কারণেই বনধের দিন ছুটি কাটানো।

body1_091118072010.jpgএকটা সময় ছিল যখন ধর্মঘট মানেই রাস্তায় ক্রিকেট [ছবি: সুবীর হালদার]

২০১৮ সালের বাঙালি অবশ্য অনেকটাই অন্যরকম। আদালতের নির্দেশের ফলে রাস্তায় ক্রিকেট ফুটবল বন্ধ। তাই বলে ছুটি নিতে বাঁধা কোথায়? কিন্তু বাঙালি যে এখন বনধের দিনও কাজে যোগ দেন। বাড়িতে বসে আর অলস জীবন কাটায় না। এই তো সোমবারই কংগ্রেস সহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ভারত বনধের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু এত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি সেই ডাকে সাড়া দেয়নি। কলকাতা সহ বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে জনজীবন ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু কেন?

চাকুরীজীবি বাঙালিও বুঝেছে যে কাজের দিন ছুটি কাটানো এখন তাদের কাছে বিলাসিতার নামান্তর। ব্যবসায়ী বাঙালিও বুঝেছে যে বনধের দোহাই দিয়ে একদিন বাড়িতে বসে থাকা মানে প্রচুর লোকসান। ব্যবসায়ীরা অবশ্য আগেও এই কথা বুঝতেন। কিন্তু যাদের জন্য পরিষেবা তারাই যদি ছুটি কাটান তাহলে পরিষেবা চালু রাখার অর্থ কী। এখন ভিন্ন পরিস্থিতি। তাই বনধের দিন ব্যবসার ঝাপ আর বন্ধ করতে হয়না।

দেখা যাচ্ছে যে এই বাংলায় তথ্যপ্রযুক্তির মতো পরিষেবা চালু হওয়ার ফলে এই বনধের প্রভাব অনেকটা কমেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের পরিষেবা দিতে হয়। সুতারং আমাদের দেশে কর্মনাশা বনধের দিনে বাড়িতে বসে থাকা চলবে না। যেনতেন প্রকারে কাজে যোগ দিতেই হবে। প্রয়োজন পড়লে অফিসে থেকে আসা-যাওয়ার পরিবহণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। মোদ্দা কথা বনধের দিন বন্ধ থাকবে না শহরের আইটি হাব।

তথ্য প্রযুক্তির কর্মীরা যদি পারে তাহলে অন্য দপ্তরের কর্মীরা পারবে না কেন। পারতেই হবে। বহুজাতিক সংস্থা বা কর্পোরেট সংস্থাগুলোও এবার কঠোর হল। চাকুরীজীবি বাঙালির আর কোনও উপায় রইল না। এক হয় কাজে যোগ দিতে হবে, না হয়ে আগেভাগেই ছুটির জন্য দরখাস্ত করতে হবে। কর্তার ইচ্ছে হলে, মানে দরখাস্ত মঞ্জুর হলে তবেই ছুটি। এবং, কাগজে কলমে এক দিনের ছুটি কাটা পড়বে।

body_091118072058.jpgএখন ধর্মঘটের দিনও জনজীবন স্বাভাবিক থাকে [ছবি: পিটিআই]

চাকুরী সংক্রান্ত বা অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার অভাবের দোহাই আর দেওয়া যাচ্ছে না।

শাসক দলের যা পেশিশক্তি রাজ্য প্রায় বিরোধী শূন্য। সুতারং, শাসক দল না চাইলে বনধ সফল করতে অশান্তি সৃষ্টি করবে, কার সাধ্য? নিরাপত্তার অভাবের কোনও প্রশ্নেই ওঠে না। বর্তমান শাসক দল অবশ্য নীতিগত ভাবে বনধের বিরুদ্ধে। তাই দিদির বাংলায় তৃণমূল বনধ ডাকে না।

এর মাঝে অবশ্য অরাজনৈতিক সংস্থাগুলো (যেমন বাস মিনিবাস বা ট্যাক্সি সংগঠন) সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শেষ সাত বছরে (তৃণমূল আমলে) বেশ কয়েকবার ধর্মঘট ডেকেছিল। কিন্তু বাঙালি নিশ্চিত করেছে যে ধর্মঘট যেন বনধ না হয়ে যায়।

হাতে গোনা যে কয়েকটি বাস (অধিকাংশই সরকারি) পথে নেমেছিল তাদের আর মেট্রো রেলের উপর ভরসা করেই বাঙালি পথে নেমেছিল। ছুটির মেজাজে অলস দুপুর না কাটিয়ে বাঙালি কাজে যোগ দিয়েছিল।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment