সুনন্দা মৃত্যু মামলায় ই-তথ্যে ভরসা: গুরুত্ব বাড়ছে বৈদ্যুতিন নথির

প্রমাণ হিসাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ই-মেল, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ও কল রেকর্ডসের উপরে

 |  3-minute read |   29-05-2018
  • Total Shares

আদালতে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্ব বাড়ছে ইলেক্ট্রনিক প্রমাণের। পরপর বেশ কয়েকটি মামলা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

বিলাসবহুল হোটেলে তাঁর দেহ উদ্ধারের ন’দিন আগে কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুরকে তাঁর স্ত্রী সুনন্দা পুষ্কর যে ই-মেল করেছিলেন, তাকে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হিসাবেই দেখছে পুলিশ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তাঁর শেষ ই-মেলে সুনন্দা লিখেছিলেন, আমার বেঁচে থাকার কোনও ইচ্ছা আর নেই... আমি এখন শুধু নিজের মৃত্যুকামনাই করছি ("I have no desire to live... all I pray for is death")। সেই সময় সুনন্দা পুষ্কর সোশ্যাল মিডিয়য়ায় যে সব পোস্ট করেছিলেন, তাকেও মৃত্যুকালীন জবানবন্দির তালিকায় রেখে মামলার ৩,০০০ পাচার পাতার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) তৈরি করেছে পুলিশ। শশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, বার বার ফোন করা হলেও তিনি তাতে গুরুত্ব দেননি, সুনন্দা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পারেননি।

এই খবর অনুযায়ী, শশী তারুরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার যে মামলা হচ্ছে, তাতে প্রমাণ হিসাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ই-মেল, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ও কল রেকর্ডসের উপরে। ১৮৭২ সালের আইনে যে ইলেক্ট্রনিক প্রমাণকে প্রমাণ হিসাবে মান্যতা না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে যাকে পরোক্ষ প্রমাণ হিসাবে মনে করা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সেগুলিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বিভিন্ন মামলার ক্ষেত্রে।

couple_052918063743.jpgশশী তারুর ও সুনন্দা পুষ্কর, তখন সুখের সময়

রানি ভিক্টোরিয়ার আমলে ১৮৭২ সালে তৈরি ইন্ডিয়ান এভিডেন্স অ্যাক্টের অনেক অংশই যে এখন অকার্যকর হয়ে গিয়েছে, সে কথা পরবর্তী কালের আইন ও মামলা থেকেই স্পষ্ট। ১৮৭২ সালের আইনে যেখানে ইলেক্ট্রনিক প্রমাণকে কোনও প্রমাণ হিসাবে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি, এবং আইনের আদালতে তা গ্রাহ্য হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে ২০০০ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন তৈরি হওয়ায় ১৮৭২ সালের আইনের কোনও কোনও অংশের কার্যত বিলোপ ঘটে।

আদালতে এখন প্রমাণ বলতে যেগুলি পেশ করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডস, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের ভিডিও রেকর্ডিং, সিডি-ডিভিডি প্রভৃতি। অপরাধী শনাক্তকরণে এবং অপরাধ প্রমাণে এখন নথি হিসাবে এই সব পেশ করা হয় আদালতে। আদালতে তা গ্রহণ করে।

whatsapp_052918063808.jpgহোয়াটসঅ্যাপ-কেও মান্যতা দিয়েছে উচ্চ আদালত

তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ডেটার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেই সংজ্ঞায় স্পষ্ট করে করে দেওয়া হয়েছে কোনগুলি ডেটা। তবে সেগুলি প্রত্যয়িত হতে হবে। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তির কল রেকর্ডস আদালতে যখন পেশ করা হবে তখন সংশ্লিষ্ট সংস্থা জানিয়ে দেবে যে এই তথ্য সঠিক। বিভিন্ন মামলায়, অর্থাৎ ছিনতাই-রাহাজানি-ডাকাতির ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে অপরাধী চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে। ভয়েজ কল রেকর্ডও একই রকম ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কিছুদিন আগেই এ রাজ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় নির্দিষ্ট আইন এখনও পর্যন্ত নেই বলে ই-মেল মারফৎ পাঠানো মনোনয়নে গুরুত্ব দেয়নি দেশের আদালত। এ নিয়ে কোনও কথা শুনতেও চায়নি। মনে রাখতে হবে, তখন সামনেই ছিল নির্বাচন। এ নিয়ে শুনানি দীর্ঘয়িত হলে তাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটাই ব্যাহত হত। তবে ই-মেল মারফৎ পাঠানো মনোনয়ন বাতিলও করেনি আদালত, এ কথাও বলেনি যে ই-মেল মারফৎ মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো মনোনয়নও গ্রাহ্য করেছিল কলকাতা হাইকোর্ট এবং তা বাতিল করেনি সর্বোচ্চ আদালত।

supreme_body_052918063839.jpgদেশের আদালতে এখন গুরুত্ব বাড়ছে ই-তথ্যের

সংসদে হামলার ঘটনায় ইলেক্ট্রনিক প্রমাণ নিয়ে দীর্ঘ শুনানি হয়েছিল। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় ইলেক্ট্রনিক প্রমাণ নিয়ে বিচারেও দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছিল বিচারপতিদের। কোনও ব্যাপারে নির্দিষ্ট আইন না থাকলে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ই আইনের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে। যে ভাবে ইলেক্ট্রনিক প্রমাণের গুরুত্ব বাড়ছে এ বার সরকারের এ নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।

ব্রিটিশ আইন সিভিল এভিডেন্স অ্যাক্ট ১৯৬৮-তে বৈদ্যুতিন নথিকে প্রামাণ্য হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে যদিও আর পাঁচটা আইনের মতো এই আইনেও নানা ধারা-উপধারা রয়েছে। পরবর্তী কালে ব্রিটেনে ক্রিমিন্যাল এভিডেন্স অ্যাক্টও বদল করা হয়েছে। ভারতের অধিকাংশ আইনই ব্রিটিশ আইনের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে, এভিডেন্স অ্যাক্টও তার ব্যতিক্রম নয়। সময় বদলের সঙ্গে এ বার এই আইন বদলের কথাও ভাবা দরকার সরকারের।

২০০৫ সালের তথ্যের অধিকার আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে স্পষ্ট ভাবেই তথ্য কম্পিউটারাইজড করা এবং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে তা আনার কথা বলা হয়েছে। দেশে সাইবার অপরাধ রুখতে আইনও করা হয়েছে। এ বার তাই ই-বার্তাকে মান্যতা দেওয়ার জন্য এবং ই-প্রমাণকে প্রাথমিক প্রমাণ হিসাবে মান্যতা দেওয়ার কথা ভাবা দরকার সরকারের।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment