শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অবজ্ঞা এ রাজ্যে, হিন্দু ভোটারদের খুশি রাখতেই কি?

দীপাবলির সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বায়ুদূষণ সূচক ছিল ৩৪৬, রবীন্দ্রভারতীর ৩৫৪

 |  5-minute read |   08-11-2018
  • Total Shares

কলকাতার মধ্যেই দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত অপেক্ষাকৃত নতুন একটি পাড়া। বছর দশেক হল এখানে জনবসতি তৈরি হয়েছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি বিভিন্ন জেলা থেকেও নতুন নতুন বাসিন্দারা এসে এখানে বসতি গড়ে তুলেছেন। ভিন রাজ্য থেকে কর্মসূত্রে কলকাতায় আসা কিছু মানুষও এই পাড়ায় আস্তানা নিয়েছেন। ২০১১ সালে কলকাতা পুলিশের আওতায় এসেছিল এই পাড়া। আর, ২০১৩ সালে নতুন একটি থানা গড়ে এই পাড়াকে সেই নতুন থানার এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। থানার ভবনটি (মানে পুলিশ স্টেশনটি) এই পাড়াতেই অবস্থিত।

কিন্তু তাতেও শব্দবাজির দাপট কমানো গেল না এই পাড়ায়। উল্টে গত বছর দু'বছরের থেকে এ বছর শব্দবাজির দাপট বেশি ছিল বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশও, যাকে বলে, ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা পালন করেছেন। পাড়ার এক বাসিন্দার অভিযোগ কালীপুজোর দিন তাঁর পাশের বাড়ি ছাদে নাকি বিকেল থেকেই দেদার বাজি পুড়েছে ও ফেটেছে। এর মধ্যে সিংহভাগই ছিল শব্দবাজি। পাড়ার এই বাসিন্দার কথায়, "প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝামেলা করব না। তাই কোনও বিবাদে যেতে রাজি হয়নি। শেষে, সহ্যের সীমা অতিক্রম হওয়ায় থানাতে ফোন করে জানালাম। 'লোক কম আছে। দেখছি কতদূর কী করতে পারি', এই বলে ফোন কেটে দিলেন থানার অফিসার।"

শেষ পর্যন্ত আশপাশের আর পাঁচটা বাড়ির বাসিন্দারা এগিয়ে এসে প্রতিবাদ জানানোর পর ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ অবশেষে বাজি ফাটানো বন্ধ হল।

কলকাতার এই 'নতুন' পাড়াটাই যেন গোটা কলকাতার তথা রাজ্যের চিত্রটা তুলে ধরছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে কার্যত বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কালীপুজো ও দীপাবলির দিন রাজ্য জুড়ে সন্ধ্যা থেকে ভোর অবধি আতসবাজি পুড়েছে। শব্দবাজিকেও জব্দ করতে পারেনি প্রশাসন।

অবস্থা কী ছিল?

আতসবাজি নিয়েও শীর্ষ আদালতের নির্দেশকে যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কার্যত আমল দিল না তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে মঙ্গলবার ও বুধবার রাতের বায়ুদূষণ সূচকেই

বুধবার, দেওয়ালির দিন সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ দিল্লির আনন্দ বিহারে বসানো যন্ত্রে বায়ুদূষণ সূচক ছিল ৩২৯। তাকে ছাপিয়ে সেই সময় কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের যন্ত্রের সূচক ৩৪৬ এবং বিটি রোডে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রের সূচক ৩৫৪। মনে রাখতে হবে এর মধ্যে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় কোনও জনবসতি নেই, মানে রেসিডেন্সিয়াল এলাকা নয়। জনবসতি কম। এখানেই যদি এই অবস্থা থাকে তাহলে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে শব্দসূচক কী ছিল তা বুঝতেই পারছেন।

body1_110818014123.jpgসুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখালো রাজ্য প্রশাসন [ছবি: রয়টার্স]

হাওড়ার সূচক দেখলে কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। সেখানে সূচক থেমেছে ৩৮২-তে। শিলিগুড়ি এবং আসানসোলের বায়ুদূষণের সূচকও ছিল যথাক্রমে ২৮০ এবং ২০৩। পরিবেশবিদদের বক্তব্য এই সূচক ২০০ পেরনো মানেই ‘খারাপ’।সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর মনে করা হয়েছিল এই সূচক ১৫০-র আসে পাশে ঘোরাফেরা করবে। কিন্ত কলকাতায় তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গিয়েছে, তাও শীর্ষ আদালতের নির্দিষ্ট করে দেওয়া বাজি ফাটানোর সময়সীমার আগেই।

মঙ্গলবারই তোয়াক্কা করা হয়নি নিষেধাজ্ঞার, যার ফলে বুধবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। স্থানীয়রা 'বাড়তি সাহস' পেয়ে যাওয়ায় বিকেল ফুরোতেই শুরু হয় বাজি ফাটানো। আতসবাজিও দেদার পোড়ানো হয়।

পুলিশি ব্যবস্থা

লালবাজার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এ বছর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর প্রতিটি এলাকায় পুলিশ আরও বেশি তৎপর থাকবে। রাজ্য পুলিশের কাছ থেকেও একই আশ্বাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল স্তরে উল্টো দৃশ্যটাই দেখা গিয়েছে।

শুধুমাত্র অভিযোগ আসার পরেই কয়েকটি ক্ষেত্রে, শব্দবাজি ফাটানোয় কয়েকটি ধরপাকড় করেছে পুলিশ। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ। এলাকার প্রভাবশালী কেউ অভিযোগ জানালে কিছু লোককে থানায় তুলে আনা হয়েছে। কিন্তু, অধিকংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনও রকম ব্যবস্থা না নিয়ে শুধুমাত্র শব্দবাজিগুলোকে আটক করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ বছর রুজু হওয়া মামলার সংখ্যাও খুবই কম।

শীর্ষ আদালতকে অবজ্ঞা কেন

বিগত কয়েক বছর দেখা গিয়েছে যে আতসবাজি ফাটানো নিয়ে কলকাতা পুলিশ এলাকায় বেশ কড়া থাকে। জেলাগুলোতে পুলিশ কম তৎপর থাকলেও তার পিছনে বেশ কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। জেলার এক একটি থানা এলাকার আয়তন বিশাল। পুলিশকর্মীর সংখ্যা কম। তাই ইচ্ছে থাকলেও পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার অবকাশ কম ছিল। তবে জেলা ও কলকাতা পুলিশের আধিকারিকরা বাজি 'পাচারের' উপর বিশেষ নজর রাখত।

বাজিবাজারগুলোর উপর চলত টহলদারি। এমনকি, কলকাতা পুলিশের সীমানা এলাকাগুলোতে গাড়িতে তল্লাশি চালানো হত। যাতে কেউ 'বেআইনি' বাজি কিনে শহরে প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু এ বছর দীপাবলি বা কালীপুজোর আগে সে রকম তল্লাশি চোখে পড়েনি। তাই উৎসাহী ক্রেতাদের শব্দবাজি মজুত করতে কোনও সমস্যাই হয়নি।

তার মানে এক নয় দু'ক্ষত্রে তৎপরতা দেখায়নি প্রশাসন - বেআইনি বাজি কেনা বেচার ক্ষেত্রে এবং শুধুমাত্র শীর্ষ আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমায় বাজি ফাটানোর ক্ষেত্রে। কিন্তু কেন?

থানার স্তরের পুলিশদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার। তাদের উপর 'অলিখিত' নির্দেশ ছিল যে থানা এলাকায় যেন কোনও ধরণের ঝামেলা না হয়। কাগজে কলমে উপর মহল থেকে শীর্ষ আদালতের নির্দেশ নিয়ে যাই আদেশ আসুক না কেন সেই আদেশ পালনের ব্যাপারে কোনও চাপ সৃষ্টি করেনি। কিন্তু কেন?

body_110818014210.jpgনজরদারি চালানো হল না নিষিদ্ধ বাজি বেচাকেনার উপরর [ছবি: পিটিআই]

এর পিছনে কারণটা অবশ্যই রাজনৈতিক। বেশ কিছুদিন থেকেই সংখ্যালঘু তোষণের পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের 'খুশি' করতে চাইছে তৃণমূল। দুর্গাপুজোর আগে রাজ্যের প্রতি পুজো কমিটিগুলোকে দশ হাজার টাকা করে 'চাঁদা' দেওয়ার কথা ঘোষণা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। এই সিদ্ধান্ত যাতে বহাল থাকে তার জন্য শীর্ষ আদালত অবধিও গিয়েছিল রাজ্য সরকার।

আসলে, বিজেপিকে কোনও মতেই রাজ্যের হিন্দু ভোটারদের মন জয় করতে করে দিতে রাজি নয় তৃণমূল। তাই ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে হিন্দুদরদী পদক্ষেপের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

এ রাজ্যে দীপাবলি মূলত উদযাপন করে রাজ্যের অবাঙালিরা - গুজরাটি, সিন্ধি, মাড়োয়ারি এবং উত্তরপ্রদেশের থেকে আগত এ রাজ্যের বাসিন্দারা। সামনের সপ্তাহে আবার ছট পুজো যা মূলত বিহার থেকে আসা রাজ্যের বাসিন্দারা পালন করেন। এই প্রত্যকেটি সম্প্রদায় কিন্তু এ রাজ্যে আলাদা আলাদা ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবে গণ্য হয়। আর, এই ভোট ব্যাঙ্কের ভোট যাতে বিজেপির বাক্সে না পড়ে সে দিকে সজাগ নজর রয়েছে তৃণমূলের।

তার প্রতিফলনই দেখা গেল শব্দবাজি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে অবজ্ঞার মাধ্যমে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ পরে হবে, তার চেয়ে ঢের বেশ গুরুত্বপূর্ণ লোকসভার নির্বাচনের আগে ভোটারদের খুশি রাখতে পারা। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আদালতের নির্দেশকে অবজ্ঞা করা নিয়ে কংগ্রেস কিংবা বিজেপির মতো বিরোধীরা প্রতিবাদে সরব হয়নি। সরব হওয়া তো দুরঅস্ত্ সামান্য মুখ খুলতেও দেখা যায়নি।

এরই ফাঁকে অবশ্য খুশি রাখতে গিয়েই শহর তথা রাজ্যের পরিবেশ দূষণের মাত্রা বিপদ সীমা অতিক্রম করে ফেলল। কিন্তু, তাতে আর কার কী ক্ষতি হল? ভোটের কাছে সবকিছুই তো তুচ্ছ।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment