আদালতের নির্দেশ কার্যকর হলে বাঙালি বলতে পারবে: হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো
সম্প্রতি একাধিক বাজি কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, এই কারখানাগুলোর অধিকাংশই বেআইনি
- Total Shares
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের জেরে এই রাজ্যেই সর্বপ্রথম শব্দ বাজির দাপট কমেছিল। আর এবার তো সুপ্রিম কোর্ট যে কোনও ধরণের শব্দবাজির সময়সীমা বেঁধে দিল। আর, এর পরেই, নতুন একটি প্রশ্নের সূত্রপাত - শব্দবাজির বিধিনিষেধ নিয়ে যে রাজ্য গোটা দেশকে পথ দেখিয়েছিল সেই রাজ্য সুপ্রিম কোর্টের নয়া বিধানকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে পারবে তো?
প্রশ্নটি কেন আসছে সে বিষয় পরে আলোকপাত করা যাবে। আগে দেখে নেওয়া যাক দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দিশ ঠিক কী।
গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এ কে সিক্রি এবং বিচারপতি অশোক ভূষণের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, দিওয়ালিতে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজি পো়ড়ানো যাবে। ২৫ ডিসেম্বর এবং ৩১ ডিসেম্বর-১ জানুয়ারি রাতে (মানে ইংরেজি নববর্ষের রাতে) রাত পৌনে বারোটা থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত বাজি ফাটানো যাবে।
এই নির্দেশে বলা আছে, শুধুমাত্র কম ধোঁয়া ছড়ানো এবং নির্দিষ্ট শব্দমাত্রার বাজিই বিক্রি করা যাবে। অর্থাৎ, বাকি সমস্ত শব্দবাজিই বেআইনি বলে ঘোষিত হল। এ ছাড়া অনলাইনে বাজি বিক্রির উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। নির্দেশে বলা হয়েছে যে দেশের প্রতিটি থানা ভিত্তিক এই নির্দেশ বলবৎ করতে হবে। কোনও এলাকায় নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসির উপরে বর্তাবে।
রাজ্যের অধিকাংশ বাজি কারখানা বেআইনি [ছবি: পিটিআই]
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই নির্দেশ কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কারণ সম্প্রতি একাধিক বাজি কারখানায় দুর্ঘটনার ঘটেছে এবং এই বাজি কারখানাগুলোর অধিকাংশই বেআইনি।
২০১২ সালে বেআইনি বাজি কারখানা নিয়ে জাতীয় পরিবেশ আদালতে মামলা করে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। এই মামলা চলাকালীন জানা গিয়েছিল যে রাজ্যের কয়েক হাজার বাজি কারখানার মধ্যে মাত্র তিনটির ছা়ড়পত্র রয়েছে। পরবর্তীকালে অবশ্য ছাড়পত্র পাওয়া বাজি কারখানার সংখ্যা চব্বিশে এসে দাঁড়িয়েছে। যে রাজ্যে বেআইনি বাজি কারখানার এত রমরমা সে রাজ্যে আইন কতটা প্রয়োগ করা যাবে তা নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই।
তবে কাগজে কলমে রাজ্য পুলিশ ইতিমধ্যেই ময়দানে নেমে পড়েছে। বিভিন্ন জেলার পুলিশসুপার বেআইনি বাজি কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুলিশও নজর রাখছে শহরের বাজির দোকানগুলোর উপরে। পুলিশ সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে প্রতি বছরের মতো এবারেও কালী পুজো ও দীপাবলির জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান ছকা হবে যাতে পুলিশকর্মীরা পাড়ায় পাড়ায় নজরদারি করতে পারেন।
প্রশাসন পারবে তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পালন করতে? [ছবি: পিটিআই]
এই মাস্টারপ্ল্যান গত বছরও ছিল। তার আগের বছরও ছিল। তারও আগের বছর ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও শহর ও শহরতলির বুকে শব্দবাজির দাপট খুব একটা কমতে দেখা যায়নি। বড় বড় হাউসিং কমপ্লেক্সে শব্দবাজি ফেটেছে দেদার। যদিও পুলিশের তরফ থেকে এবার একটা আশার আলো শোনা যাচ্ছে। এক উচ্চপদস্থ পুলিশকর্মী জানাচ্ছেন, "শব্দবাজির ডেসিবেল মাপার মতো পরিকাঠামো আমাদের নেই। তাই অনেক সময় শব্দবাজির (পড়ুন ফাটানোর) হদিস পেলেও আমরা ব্যবস্থা নিতে পারিনা। কিন্তু এ বছর নির্দেশটা বেশ পরিষ্কার। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কোনও ধরণের শব্দবাজি ফাটানো যাবে না। সুতরাং ব্যবস্থা নেওয়াটা অনেক সহজ হবে।"
গত কয়েক বছরে কালীপুজো ও দিওয়ালির সময় কলকাতা এবং অন্যান্য শহরে ধোঁয়াশা ধরা পড়েছিল। পরিবেশবিদরা বলছেন, বাজির ধোঁয়ার ক্ষতিকর রাসায়নিক শ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে ঢোকে। হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের ক্ষেত্রে তা মারাত্মক হতে পারে। পরিবেশকর্মীদের দাবি, গত কয়েক বছরে শব্দবাজি সে ভাবে কমেনি কিন্তু বে়ড়ে গিয়েছে আতসবাজির দূষণ।
কি হবে এ বছরে?
কিছুই না করতে পারলে বছর বছর যা চলছে তাই চলবে। আর প্রশাসন যদি সত্যি সত্যি এই নির্দেশ পালন করতে পারে তাহলে ২১ শতকে দাঁড়িয়েও বাঙালি সগর্বে বলতে পারবে, "হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।"

