অবশেষে বৃদ্ধি পেল ট্যাক্সি ভাড়া, কিন্তু হ্রাস পেল না যাত্রী প্রত্যাখ্যান
জরিমানার পরিমাণ নিমিত্ত মাত্র, তাই কোনও দিনও বন্ধ হবে না যাত্রী প্রত্যাখ্যান
- Total Shares
ট্যাক্সি মালিকদের কাছে সুখবর: অবশেষে ট্যাক্সির ভাড়া বৃদ্ধি হল। যাত্রী সাধারণের কাছে দুঃসংবাদ: এর পরেও যাত্রী প্রত্যাখ্যান হ্রাস পেল না।
ডিজেলের দাম আকাশ ছুলেও সরকার ভাড়া বাড়াতে নারাজ, এর ফলেই নাকি যাত্রী প্রত্যাখ্যান। মহানগরীর পথে পা রাখলেই এই অজুহাত কানে পৌঁছাতে বাধ্য। এই অজুহাত কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় তৈরি হয়নি, জ্যোতি বসুর আমলেও এই অজুহাত ছিল বহুচর্চিত। কিন্তু ভাড়া বৃদ্ধির পরেও যাত্রী প্রত্যাখ্যান কমে না। কোনও দিনও কমেনি, এবারেও কমার সম্ভাবনা নেই। অত্যাধুনিক অ্যাপ ক্যাবের প্রভাবের শহরের নিজস্ব সেই বিখ্যাত হলুদ ট্যাক্সির সংখ্যা এখন অনেকটাই কম। কিন্তু, তা সত্ত্বেও, নিত্যদিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে যাত্রী প্রত্যাখ্যান।
কিন্তু কেন?
প্রত্যাখ্যান মালিকরা করেন না। করেন চালকরা। আর, চালকদের দাবি যে ভাড়া বৃদ্ধির সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে 'ওয়েটিং চার্জ'বৃদ্ধি করা হয় না। আর , তাই চালকদের ভাড়া বৃদ্ধি পরও কোনও লাভ হয় না। শহরের ট্যাক্সি পরিষেবায় 'বাতচিৎ' বলে একটি বহুলপ্রচলিত রীতি রয়েছে। এই 'বাতচিৎ' প্রথার সারমর্ম হল মুখের কথায় গাড়ি ভাড়া দেওয়া। অর্থাৎ, চালক নির্দিষ্ট একটি ভাড়ায় মালিকদের কাছে ট্যাক্সি ভাড়া নেন। তার পরে নিজের পয়সায় ডিজেল কিনে সারাদিন ট্যাক্সি চালান। দিনের শেষে মালিকদের প্রাপ্য ভাড়া ও ডিজেলের দাম বাদ দিয়ে যা পরে থাকে তাই চালকদের নীট আয়ে।
উল্টোদিকে, প্রতিদিন ভাড়া হিসেবে যা পান তার থেকে গাড়ির মেরামতি ও ঋণ শোধের ইএমআইয়ের (যদি থেকে থাকে) খরচ বাদ দিলে যা পড়ে থাকে তা মালিকদের নীট আয়ে। পুলিশি মামলার ক্ষেত্রে মামলা যদি চালকের বিরুদ্ধে রুজু করা হয় তাহলে জরিমানার টাকা চালককে বহন করতে হয় আর মামলা যদি গাড়ির নম্বরের বিরুদ্ধে হয় তাহলে জরিমানার টাকা মালিকদের বহন করতে হয়।
প্রত্যাখ্যান মালিকরা করেন না, করেন চালকরা
চালকদের দাবি 'ওয়েটিং চার্জ' না বাড়ার ফলে জ্যামে ফেঁসে গেলে তাদের লোকসান হয়। একজন যাত্রীকে গন্তব্যে পৌছিয়ে দিতে সময় বেশি লাগে এর ফলে ভাড়ার সংখ্যা কমে যায়। গাড়ি আসতে আসতে চলে বলে এর প্রভাব মাইলেজের উপর পরে, অর্থাৎ, জ্বালানি বেশি খরচ হয়। শুধুমাত্র ভাড়া বৃদ্ধি করলে তাঁদের উপার্জন বাড়ে না। কারণ ভাড়া বৃদ্ধির দিন থেকেই মালিকরা 'বাতচিৎ' -এর পরিমাণ বাড়িয়ে দেন।
কিন্তু এই বার তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে যে ভাড়া বৃদ্ধি হয়েছে তাতে মূল ভাড়ার পাশাপাশি 'ওয়েটিং চার্জও' বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পরেও যাত্রী প্রত্যাখ্যান কেন?
অজুহাতের অভাব কখনই হয় না। এক্ষেত্রেও হয়নি। এখন চালকদের অজুহাত যে পরিমাণ ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে সেই অনুপাতে ভাড়া বা 'ওয়েটিং চার্জ' বৃদ্ধি পায়নি। ওলা উবেরের যুগেও তাঁরা যাত্রী প্রত্যাখ্যান করতে সাহস পান। তাও আবার আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে।
প্রত্যাখান বন্ধ কী ভাবে সম্ভব?
বর্তমানে যাত্রী প্রত্যাখ্যানেয় জন্য যে আইন বলবৎ রয়েছে তাতে প্রত্যাখ্যান ঠেকানো অসম্ভব। কারণ সেই আইন অনুযায়ী সামান্য কিছু টাকা জরিমানা দিতে চালকদের গায়ে লাগে না। বরঞ্চ, যাত্রীদের এরকম অভিজ্ঞতা রয়েছে যেখানে চালক নির্দ্বিধায় যাত্রী প্রত্যাখ্যান করে জরিমানা দিতে রাজি আছেন। এর কারণ প্রত্যাখ্যান না করলে যা লোকসান গুনতে হবে তার চেয়ে জরিমানার পরিমাণ কম।
পরিবহণ দপ্তরে দায়িত্ব যখন মদন মিত্রের হাতে ছিল একমাত্র তখনই যাত্রী প্রত্যাখ্যান হ্রাস পেয়েছিল। সেই সময়, পরিবহণ মন্ত্রীর নির্দেশে কোনও চালকের বিরুদ্ধে প্রত্যাখানের অভিযোগ উঠলেই পুলিশ এমন এমন ধারায় মামলা দায়ের করত যাতে জরিমানার পরিমাণ পাঁচ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই স্ট্রাটেজি কিন্তু ম্যাজিকের মতো কাজও দিয়েছিল।
একমাত্র মদন মিত্রের আমলে পুলিশি চাপে প্রত্যাখ্যান কমেছিল
কলকাতায় যে কয়েকটি ট্যাক্সি সংগঠন রয়েছে এর প্রত্যেকটি মালিকদের সংগঠন (কিছু সংগঠন চালকদের নিয়ে শুরু হলেও এখন সবকটি সংগঠনের সদস্যরা ট্যাক্সির মালিক হয়ে গিয়েছেন)। তাই সরকারের এই পদক্ষেপের পরেও তারা চুপ করে রইলেন। আর, এই বাজারে ময়দানের নেমে পড়লেন সিটু নেতৃত্ব। চালকদের একত্রিত করে মাত্র তিন মাসের মধ্যে সাত বার ট্যাক্সি ধর্মঘট হল কলকাতায়। এর মধ্যে শেষ ধর্মঘট একটানা পাঁচদিন ধরে চলল।
সিটুর এই আন্দোলন দীর্ঘকালীন প্রভাব ফেলল। তাদের আন্দোলনে যে ভাবে ট্যাক্সি চালকরা সাড়া দিলেন তাতে ভয় পেল তৃণমূল। ফল সরূপ, পাঁচ হাজার টাকার জরিমানা বন্ধ আর যাত্রী প্রত্যাখ্যান শুরু।যাত্রী প্রত্যাখান কোনও দিনও বন্ধ হবে না কলকাতায়, একমাত্র যদি না ওলা উবেরের চাপে মিটার ট্যাক্সির পরিষেবাটাই পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

