বাড়ির কাছে স্কুল হলে শিক্ষিকারা শিক্ষকতায় মন দিতে করতে পারবেন, সংসারেরও সুবিধা হবে
মহিলাদের পারিবারিক দায়বদ্ধতা পুরুষদের চেয়ে আলাদা, তাঁদের নিরাপত্তার প্রশ্নও রয়েছে
- Total Shares
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে শিক্ষিকারা যাতে নিজেদের জেলাতেই নিযুক্ত হতে পারেন সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখছে সরকার। খুব দ্রুতই এই বিষয় ইতিবাচক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখা হবে।
দু'বছর আগেও শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে শিক্ষিকারা যাতে নিজেদের জেলার মধ্যেই নিযুক্ত হতে পারেন সেই বিষয়টি নিয়ে সরকার ভাবনাচিন্তা করছে এবং একটা সুরাহার পথও বেরোবে। যদিও এই বিষয়টি আর তার পর থেকে আর এগোয়নি। এ বারেও আবার শিক্ষামন্ত্রী একই কথা জানিয়েছেন।
২০১৩ সালের পর থেকেই বিভিন্ন কারণে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ বন্ধ ছিল। এই বছর আবার নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। একটা সরকারি চাকরি পেতে আমরা অনেকেই চাই। তাই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একটা সরকারি চাকরি পেলে সেটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয় আমার যেখানে পোস্টিং পাই সেখানেই ছুটে যাই।
শিক্ষিকাদের দূরদূরান্তে পোস্টিংয়ের দুর্ভোগ কী এবার ঘুচবে?
হাজার হাজার শিক্ষিকাকে চাকরির সূত্রে নিজেদের জেলা থেকে বহু দূর-দূরান্তে গিয়ে চাকরি করতে হয়। তাতে মারাত্মক সমস্যা হয়। এর ফলে যাতায়াতেই অনেকটা সময় কেটে যায়। এ ভাবে একেক জন শিক্ষিকা প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত চাকরি করছেন। তাই আমরা কিন্তু কেউ মাত্র কয়েকবছর চাকরি করেই বদলির কথা বলছি না।
অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষিকাকে প্রত্যেকদিন বহু দূরে গিয়ে চাকরির করতে হয় তাই অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াত করে চাকরি করা সম্ভব হয় না বলে বাবা-মা, স্বামী, সংসার এবং সন্তানকে ছেড়ে কর্মস্থলেই থাকতে হয়। আমি নিজে সংসার এবং সন্তান ছেড়ে বাড়ি থেকে প্রায় ৫৭০ কিমি দূরে থেকে চাকরি করি।
স্কুল যদি বাড়ির পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হয় তবেই তা আদর্শ।
স্কুল যদি বাড়ির পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হয় তবেই তা আদর্শ
স্কুল সার্ভিস কমিশনের ফর্মে যদিও নিজেদের সুবিধা মতো জোন বা জায়গা পছন্দ করার একটা সুযোগ আছে, তবে সেই জোনে কোনও শূন্যপদ না তাখলে শিক্ষিকাকে অন্যত্র নিয়োগ করা হয়। তাই সরকার যখন বদলির একটা সুযোগ দিয়েছেন তখন আমরা যাঁরা এতো দিন ধরে এভাবে চাকরি করে আসছি তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আমরা এখানে কোনও রকম লিঙ্গ বৈধম্য করার কথা বলছি না। তবে আমার মনে হয় সমাজের নিয়ম অনুসারে সংসারের প্রতি মহিলার তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি দায়বদ্ধতা থাকে। এ ছাড়াও একজন মহিলার শারীরিক পরিশ্রম করার ক্ষমতা পুরুষদের চেয়ে কম। পাশাপাশি তাঁদের একটা সামাজিক নিরাপত্তার দিকও আছে। আমরা যারা রাতের অন্ধকারে এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে একটা সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা জায়গায় গিয়ে নামি তখন আমরা অসম্ভব নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। এ যুগে চার দিকে যখন মহিলাদের উপর অত্যাচারের ঘটনা একটা রোজনামচা হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তার দিকটা একেবারে উড়িয়ে দিলে চলবে না। আমার সন্তান ব্যান্ডেলে থাকে আর আমি কর্মসূত্রে ময়নাগুড়িতে থাকি। যদি কখনও শুনি যে আমার সন্তানের বা পরিবারের কারও কোনও সমস্যা হয়েছে তখন কী আমি কাজে মনোনিবেশ করতে পারব? এতে কাজেরও ক্ষতি হবে।
ঠিক একই ভাবে এমন অনেক অবিবাহিত শিক্ষিকা আছেন যাঁদের এমন সব জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হয় যে তাঁরা নিজেদের সংসার শুরু করার কথাও ভাবতে পারেন না বা বয়স্ক বাবামায়র খেয়াল রাখতে পারেন না। আবার এমন বহু শিক্ষিকা আছেন যাঁরা বছরের পর বছর অত্যন্ত অসুস্থতা নিয়ে কাজ করে চলেছেন এমনকি তিনি যেখানে রয়েছেন সেখানে যথেষ্ট চিকিৎসার সুযোগ নেই বলে চিকিৎসা করতে পারছেন না। আমার একজন পরিচিত শিক্ষিকা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যাতায়াত করতেন বলে তিনি অপরিণত শিশুর জন্ম দেন।
২০১৩র পর থেকেই বিভিন্ন কারণে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ বন্ধ ছিল
অনেকসময় আমাদের মিউচুয়াল ট্রান্সফারের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। তবে এই ধরণের বদলি কদাচিৎ হয়। তাই আমরা প্রায় ৩০০০ শিক্ষিকা মিলে একটি সংগঠন তৈরি করেছি যার নাম "উই দা লেডি টিচার্স গ্রুপ''। সংগঠনের তরফ থেকে আমরা সরকারকে বহুবার এই বিষয়টি নিয়ে আবেদন-নিবেদন করেছি।
এমন ঘটনা আরও বহু আছে। তাই এই সব দিকগুলো বিচার করে সরকার যদি খুব দ্রুত কোনও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা হলে হাজার হাজার শিক্ষিকা সত্যি উপকৃত হবেন।

