সরকারি বাসের যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য এখন প্রশ্নাতীত

বন্ধুরা মজা করে বলতাম, "সরকারি বাস খুজঁছিস? ঈশ্বরকে ডাক, দেখবি বাসের আগে ঈশ্বরকে পেয়ে যাবি।"

 |  4-minute read |   14-03-2018
  • Total Shares

বেশি দিন আগেকার কথা নয়। মেরেকেটে বছর দশেক কি এগারো হবে। আমরা বন্ধুরা মজা করে বলতাম, "সরকারি বাস খুজঁছিস? ঈশ্বরকে ডাক, দেখবি বাসের আগে ঈশ্বরকে পেয়ে যাবি।"

ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে আপনি হয়ত লজঝড়ে সেই বাসগুলোর একটি চোখের সামনে দেখতে পেতেন। কিন্তু চড়তে পারতেন কিনা সে বিষয় নিশ্চয়তা ছিল না। আপনি হয়ত বাস স্টপেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু বারবার হাত দেখানো সত্বেও বাসটি আপনার চোখের সামনে দিয়ে তিরবেগে বেরিয়ে যেত। বাসগুলোর ভিতরের অবস্থা তথৈবচ। ভাঙাচোরা আসন, জং ধরা হ্যান্ডেল, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরণের পোস্টার সাঁটা এবং অপরিষ্কার মেঝে। এক কথায় যাকে বলে নরককুণ্ড।

চিত্রটা কিন্তু ২০১৮ সালে অনেকটাই বদলেছে। সরকারি বাসের মিছিলে এখন শোভা পাচ্ছে একগাদা ঝা চকচকে নীল সাদা রঙের নতুন বাস। এদের মধ্যে আবার বেশ কয়েকটি শীত তাপ নিয়ন্ত্রিত। পরিবহণ দপ্তরের আধিকারিকরা শুধু নতুন বাস কিনেই ক্ষান্ত হননি, বিশ্ব.ব্যাঙ্কের অর্থ অনুদানে তৈরি করেছেন নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ। যে সব সরকারি বাস এখন রাস্তায় চলছে তাদের এই মুহূর্তের অবস্থান সহজে জেনে ফেলা যায় এই অ্যাপটির ম্যাধমে। বাসের মধ্যে চালু হয়েছে পরিবহণ দপ্তরের নিজস্ব বেতার ব্যবস্থা।

‘ক্যাশ-লেস’ রাইডও চালু করা হয়েছে বেশ কয়েকটি সরকারি বাসে। যাত্রীদের কার্ড কিনতে হবে, এর পর বাসে উঠে কন্ডাকটরকে সেই কার্ড দিলে কন্ডাক্টর সোয়াপিং মেশিনে সেই কার্ড সোয়াইপ করলে শুধুমাত্র বাস ভাড়াটি কার্ডের ব্যালান্স থেকে বাদ চলে যাবে।

body1_031418053413.jpgসরকারি বাসের মিছিলে এখন শোভা পাচ্ছে একগাদা ঝা চকচকে নীল সাদা রঙের নতুন বাস

শুরুর দিনগুলো

২১ শতকের প্রথম দশকের শেষের দিকে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার প্রথমবার সরকারি উদ্যোগে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাস পথে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়। হাওড়া স্টেশন, টালিগঞ্জ ও ধর্মতলার মতো শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো থেকে বিমানবন্দর অবধি এই বাসগুলো চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এই সময় সরকারি প্রক্রিয়ায় কোনও বাস কেনা হয়নি। রুট পারমিট সরকারের নামে তৈরি করা হয়। এর পর বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (যাদের শীত তাপ নিয়ন্ত্রিত বাস রয়েছে) এই রুটগুলিতে বাস চালানোর ফ্র্যাঞ্চাইজি দেওয়া হয়। একেবারে শুরুর দিনগুলো থেকে সরকারের এই প্রকল্প চূড়ান্ত সফল।

body1_031418052948.jpg২০১৫ সালে পরিবহণ কমিটি গঠন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি

২০১১ এ তৃণমূল সরকারে আসার পরেই পরিবহণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজার সিদ্ধান্ত নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল সরকারের দ্বিতীয় পরিবহণ মন্ত্রী মদন মিত্রের আমলে শুরু হল সরকারি উদ্যোগে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ও সাধারণ বাস ক্রয় করবার প্রক্রিয়া। মূলত দুটি সংস্থার থেকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাস ক্রয় করা হচ্ছে - দেশীয় সংস্থা অশোক লেল্যান্ড ও বিদেশী সংস্থা ভলভো। স্বভাবতই, দুটি বাসের ভাড়ার হেরফের রয়েছে।এই মুহূর্তে হাজারের অধিক নতুন শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ও সাধারণ বাস রয়েছে পরিবহন দপ্তরের।

পরিকাঠামোগত উন্নয়ন

২০১৫ সালের মে মাসে সরকারি পরিবহণের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্যে পরিবহণ কমিটি গঠন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি মূলত, সরকারি বাসে যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াবার জন্য এই উদ্যোগ। এই কমিটির সুপারিশ করা প্রকল্পগুলোর সুফল এখন আমরা ভোগ করছি।

প্রথমত, এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পথদিশা নামে মোবাইল অ্যাপ। প্রচুর যাত্রী এখন এই অ্যাপ দেখে যাতায়াতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছেন। এই অ্যাপটির সবচেয়ে বড় সুবিধা, গন্তব্যের দিকে যে রুটের বাস যাবে সেই সব বাসগুলোর বর্তমান অবস্থান দেখে নেওয়া যায় এবং সেই মতো হিসাব কষে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করা যায়। অনেকে তো আবার এই অ্যাপ দেখে বাড়ি বা অফিস থেকে বাস স্ট্যান্ডের উদেশ্যে রওনা দেন যাতে বাস পৌঁছাবার ঠিক আগে আগে তাঁরা বাসস্ট্যান্ডে পৌছিয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত টিকিট ব্যবস্থা। অনেকটা এটিএম মেশিনের মতো সোয়াইপিং মেশিন কিনেছে পরিবহণ দপ্তর। যেখানে পরিবহণ কার্ড ব্যবহার করা যায়। এমনকি নগদেও টিকিট কাটা যায়। এই ব্যবস্থায় টিকিটের উপর ভাড়া ছাড়াও আপনি কোথা থেকে বাসে উঠেছেন এবং কোথায় নামবেন তাও ছাপা থাকে। সবচেয়ে বড় কথা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি আধিকারিকরা অফিসে বসেই চলন্ত বাসের কন্ডাক্টরদের উপর নজরদারি করতে পারেন।

এছাড়া, শীত তাপ নিয়ন্ত্রিত বাসের যাত্রীদের জন্য চালু হয়েছে বেতার ব্যবস্থা। এই বেতার ব্যবস্থা কিন্তু আর পাঁচটা বেতার চ্যানেলের থেকে আলাদা। বিভিন্ন রুচি ও পছন্দের অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি এই চ্যানেল নির্দিষ্ট সময়ের অন্তর বাসের অবস্থান ঘোষণা করা হয়। বাসটি যদি সেই সময় কোনও বিখ্যাত ব্যক্তির নামাঙ্কিত রাস্তায় থাকে তাহলে সেই ব্যক্তি সম্পর্কিত দু-চারটি তথ্যও জানানো হয়।

ভবিষ্যতে, পরিবেশ দূষণের কথা মাথায় রেখে  বিদ্যুৎ চালিত বাস চালাবার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের অনুদানে ১৩০টি ইলেকট্রিক বাস কিনবে পরিবহণ দপ্তর। একেকটি বাসের জন্যে বিশ্ব ব্যাঙ্ক ৭ লক্ষ টাকা করে দেবে। এর মধ্যে ১০০টি বাস কলকাতা শহরে চলবে। বাদবাকি ৩০টি জেলার শহরগুলোর জন্য কেনা হচ্ছে।

লাভের মুখ

বেশ কয়েক দশক ধরেই লোকসানে চলছে সরকারি পরিবহণ সংস্থাগুলো। এহেন, পরিকাঠামো উন্নয়নের ফলে এই লোকসানের হার যে অনেকটাই কমানো গেছে তা বলাবাহুল্য।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছর পাঁচেক আগেও সরকারি বাসগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতেন। এখন শুধুমাত্র শীত তাপ নিয়ন্ত্রিত বাসগুলোতেই গড়ে প্রতিদিন এক লক্ষ যাত্রী যাতায়াত করেন। সব ধরণের বাস ধরলে এখন সরকারি বাসের যাত্রী সংখ্যা প্রতিদিন আনুমানিক আড়াই লক্ষ। নিট আয়ের পরিমাণ গত বছর ১৫ শতাংশ মতন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর আরও ২০ শতাংশ মতো বৃদ্ধি পেতে চলেছে।

বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে, যত বেশি গুড় ঢালা হবে তত বেশি মিষ্টি হবে। পরিবহণ দপ্তরের ক্ষেত্রে এই কথাটি প্রযোজ্য। প্রচুর বিনিয়োগ করে পরিকাঠামো উন্নয়ন করে নিট আয়ে বাড়িয়ে চলেছে।

আপামর জনতারও পোয়া বারো। এই মিষ্টি তো তাদেরই জন্য। সরকারি বাসের যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য এখন প্রশ্নাতীত।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment