পরিমিত নারকেল তেল শরীরের পক্ষে ভালো নাকি খারাপ
যতদিন না আরও গবেষণা হচ্ছে ততদিন সাধারণ বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে পরিমাণ বুঝে খেতে হবে
- Total Shares
প্রথমত, নারকেল তেলে অতিরিক্ত পরিমাণে স্নেহপদার্থ থাকে বলে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা নারকেল তেলের স্নেহপদার্থকে ক্ষতিকর বলে গোড়াতেই নাকচ করে দিয়েছেন। একটা সময় ছিল যখন সবরকমের স্নেহপদার্থের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
এরপর বেশ কয়েকটি গবেষণায় জানা যায় যে নারকেল তেল অত্যন্ত পুষ্টিকর। কারণ নারকেল তেলে যে ধরণের মিডিয়াম চেন ফ্যাটি অ্যাসিড (medium chain fatty acid) আছে তা শরীরের ক্ষতি করে না। বরং এইচডিএল কোলেস্টরলকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। শরীরের জন্য ভালো এইচডিএল কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এইচডিএল কোলেস্টরল (High density lipoprotein cholesterol) আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও শরীরকে সুস্থ রাখে। যেই মাত্র হলিউড সেলিব্রিটিরা বলতে শুরু করলেন যে সুস্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য পেতে নারকেল তেলের একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে তখন হঠাৎ নারকেল তেল সুপারফুডের তালিকায় স্থান করে নিল। এরপরেই বহু মানুষ সুস্থ হৃদয় ও চকচকে ত্বক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় চামচের পর চামচ নারকেল তেল খেতে শুরু করেন।
এখন আবার বহু মানুষ নারকেল তেলের গুণাগুণ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে কারণ তাঁদের মতে নারকেল তেলে যে স্নেহপদার্থ থাকে তা হার্টের পক্ষে ক্ষতিকর। নারকেল তেল নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষের তর্কটা এখানেই সম্পূর্ণ হল।

এটা বেশ বিভ্রান্তিকর। একদিকে যেমন বিশ্বের বহু মানুষের মতে নারকেল তেল শরীরের পক্ষে ভালো ঠিক তেমনভাবেই কেউ কেউ নারকেল তেলকে বলছেন বিষ, আর বাকিরা একটা ধন্ধে রয়েছেন। সাধারণ মানুষ যে যার কথা মেনে চলেন তাঁর কথাই শুনছেন।
তাহলে, আসল সত্যিটা কী?
আমার মনে হয় যে বাস্তবটা হল এই দু'টোর মাঝামাঝি। এটা সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে হবে।
মেনে নিলাম যে নারকেল তেলে প্রচুর পরিমাণে স্নেহপদার্থ বা ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে (প্রায় ৯০ শতাংশ), যার ফলে এত সমস্যা। তবে নারকেল তেলে মিডিয়াম চেন ট্রাইগ্লিসারাইডস (এমসিটি) থাকে বলে তা যকৃতে গিয়ে খুব দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং শরীরের কোনও অংশে জমে থাকে না।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে এই এমসিটি আমাদের ছোট ছোট খিদেগুলোকে নিবারণ করে যার ফলে আমাদের বার বার খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এতে আমাদের শরীরের ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকে। নারকেল তেলে প্রায় ১৬ শতাংশ লরিক অ্যাসিড থাকে যেটি আর একধরণের এমসিটি। লরিক অ্যাসিড শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টরলের মাত্রা কম করে এবং শরীরের পক্ষে ভালো কোলেস্টরলের মাত্রা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। অনেকে মনে করেন স্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরের পক্ষে ভালো কারণ তা বিভিন্ন হরমোন উৎপাদন করতে এবং তার মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এর ফলে শরীরের কোষ সুস্থ থাকে। এখনও পর্যন্ত সবই ভালো।
তবে আসল ব্যাপারটা হল যতই হোক এটি একটি তেল। এবং যে কোনও তেলই অতিরিক্ত খাওয়া ভালো নয়। তাই নিয়ন্ত্রণ রেখে এবং সামঞ্জস্য বজায় রেখে খেতে হবে। খাদ্যতালিকায় যদি যথেষ্ট পরিমাণে ফলমূল, শাকসবজি, ফাইবার যুক্ত খাবার, পরিমিত মদ্যপান এবং চিনির পরিমাণ কম রাখা যায় তাহলে নারকেল তেল খেলে আমাদের হার্টের কোন ক্ষতি হবে না। বরং এতে আমাদের শরীর সুস্থ থাকবে। পাশাপাশি যদি খাবারে শরীরের জন্য ক্ষতিকর স্নেহপদার্থের পরিমাণ কম রাখা যায় তাহলে কোনও ক্ষতি নেই।

ঠিকঠাক তেল বাছতে করতে হবে। তফাৎটা বুঝতে হবে। অপরিশ্রুত নারকেল তেল (virgin coconut oil)-এর যেমন ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে তেমনই তার স্বাদটাও বেশ কড়া। অপরিশ্রুত নারকেল তেলের রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ করা হয় না। তবে পরিশোধিত নারকেল তেল রাসায়নিক ভাবে প্রক্রিয়া করা হয় বলে তা রান্নার জন্য ব্যবহার করা যায় এবং তা ভাজাভাজি করতে কাজে লাগে।
তবে যে নারকেল তেলকে বিভিন্ন দ্রাবকের সাহায্যে প্রক্রিয়া করা হয় সেই জাতীয় তেল যদি রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে কিন্তু সেটা আপনার শরীরের পক্ষে ভালো নয়। এর ফলে তেলে যে প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড যেমন লরিক অ্যাসিড এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শুধুমাত্র অপরিশোধিত নারকেল তেলই রান্নার কাজে ব্যবহার করা উচিত কারণে তাতে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকে।
তাই এই বিষয় আরও কিছুটা গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত নারকেল তেল খাবার সময় সাধারণ বুদ্ধি ব্যবহার করে পরিমিত মাত্রায় খাওয়াই শ্রেয়। জদিও গবেষণা আমাদের ধারণাকে আরও পরিষ্কার করবে কিংবা আমাদের মনে আরও দ্বন্দের সৃষ্টি করবে।
লেখাটি ইংরেজিতে পড়ুন

