কেরলে ভয়াবহ বন্যার জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী কে

কত ফসল নষ্ট হয়েছে? কত সম্পত্তি নষ্টের আশঙ্কা করা হচ্ছে?

 |  4-minute read |   25-08-2018
  • Total Shares

সরকারি হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা পাঁচশো ছাড়িয়েছে। বন্যা আর লাগাতার ধসের কারণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অন্তত ৬লক্ষ সাধারণ মানুষ। ৯লক্ষ ৬হাজার ৪০০ হেক্টর জমির ফলন নষ্ট। কেরলের ১৪টি জেলার মধ্যে ১৩টিই জলের নীচে।

tapan2_082518012727.jpg১৪টির মধ্যে কেরলের ১৩টি জেলা জলমগ্ন (রয়টার্স)

ভেসে গিয়েছে গ্রাম, শহর, রাস্তা, সেতু, বিমানবন্দর। কমপক্ষে ১৯হাজার ৫১২ কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। একে কি প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলব নাকি প্রকৃতির বিদ্রোহ ঘোষণা ভাবব? প্রকৃতির করাল গ্রাস, পালটা মার, বিরূপ প্রতিক্রিয়া যাই বলি কিংবা ধরি না কেন, একটা প্রশ্ন বারবারই উঠে আসছে; কেন এই বিপর্যয়? উত্তরে এই মরসুমের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কথাটা প্রাথমিক ভাবে এসেই পড়ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কেরলে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রায় ৩০শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই অতিরিক্ত জল ধরে রাখার ক্ষমতা কেরালের জলাধারগুলির ছিল না। অন্য কোনও উপায় না দেখে বাঁধ কর্তৃপক্ষ জল ছাড়তে বাধ্য হন। আর তাতেই ভেসে যায় গোটা কেরল রাজ্যের গ্রাম-গঞ্জ-শহর- নদী-নালা-ক্ষেত-খামার-ঘরবাড়ি-সেতু-বিমানবন্দর...।

উপগ্রহচিত্র পর্যবেক্ষণ করে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, ১৩ থেকে ২০ অগস্ট পর্যন্ত কেরলের উপর গভীর নিম্নচাপ ঘণীভূত হয়। যার জেরে ১৩ থেকে ২০ অগস্ট পর্যন্ত টানা প্রবল বর্ষণ। কেরলের আকাশে প্রথম দিকে ঘন মেঘ দেখা যায়, তার পরে বঙ্গোপসাগরের উপর থেকে কেরলের উপর মেঘের ঘনত্ব প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। প্রথম পর্যায়ে বর্ষার স্বাভাবিক মেঘ দেখা দিলেও পরের দিকে যে মেঘ কেরলের আকাশে ছিল তা  স্বাভাবিক নয়।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকা স্বত্বেও আগাম কোনও সতর্কতা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। ৪১.‌৪৪ শতাংশ বৃষ্টিতে বন্যার যে বিধ্বংসী রূপ তৈরি হয় তা ৪৪টি বড় জলাধারের জল একসঙ্গে ছাড়ার কারণেই। এমনকি জল ছাড়ার ব্যাপারেও কোনও আগাম সতর্কতা জারি করা হয়নি। অতএব কেবলমাত্র অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণেই যে এই বিপুল বন্যা এমনটা হতে পারে না। বরং পুরোটাই ঘটেছে একাধিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে।

চাইলে এই পরিস্থিতি অনেকখানি এড়ানো যেত কিন্তু সেটা করা হয়নি। আগাম সতর্কতা জারি না করেই একের পর এক জলাধারের জল ছাড়া হয়েছে এবং সেটা বিপুল পরিমাণে। যার জেরে নদীগুলি বিধ্বংসী আকার ধারণ করে। কেরালেয় বর্তমানে ৮২টি জলাধার, তারমধ্যে ৪২টি বৃহৎ। সব জলাধারকেই সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। কিন্তু সেটা হয় না।

একথা প্রায় প্রতিটি ভারতবাসীই জানেন যে ভারতে বর্ষা প্রথমেই আছড়ে পড়ে কেরলে। তারপর ধীরে ধীরে ছেয়ে যায় গোটা দেশে। কেরলে ফি বর্ষায় ভারী থেকে প্রবল, এমনকি লাগাতার ঝমঝমে বৃষ্টি হয়। তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জনজীবন স্তব্ধ হয়ে যায়। এর উপর কেরলে রয়েছে অতগুলি জলাধার। যেগুলির মধ্যে ইদামালায়ার, ইডুক্কি ছাড়াও বেশ কয়েকটি জলাধারের ধারণক্ষমতা ১০০ কোটি ঘন মিটারের বেশি। এগুলি ছাড়া ওই রাজ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট জলাধার। প্রতিবছর বর্ষায় ওই জলাধারগুলির প্রায় অর্ধেকটাই ভরা থাকে।

tapan4_082518011742.jpgকোচি স্টেডিয়াম থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে (রয়টার্স)

এ বছর জুলাই মাসের শেষেই বড়-ছোট সব জলাধার জলে টইটুম্বুর হয়ে যায়। আগস্ট মাসের ১০ তারিখের পর অবিরাম বৃষ্টিতে  প্রায় সব জলাধারই বিপদ সীমা ছুঁয়ে ফেলে। বাঁধ বাঁচাতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই বাড়তি জল ছাড়ে। এ ব্যাপারে কেরল সরকার নিজেই জানায়, ৯ থেকে ১৬ আগস্ট হঠাৎ যে আকাশভাঙা বৃষ্টি হবে, তার আগাম রিপোর্ট সরকারের কাছে ছিল না। অন্যদিকে বাঁধ তদারকির দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও বাঁধ থেকে নিয়মিত জল ছাড়ার কথা ভাবেননি। তাঁরা এটাই ভেবেছিলেন, বর্ষার পরও জলাধারগুলি জল বোঝাই রাখলে রাজ্যেরই লাভ।

জলাধার থেকে জল ছেড়ে বাঁধ বাঁচানো গেল ঠিকই, কিন্তু তাতে বন্যা ঠেকানো গেল না। তা ছাড়া কেরলের নদীগু্লির জলধারণ ক্ষমতাও প্রাকৃতিক নিয়মে কমে গেছে। শহরগুলির বর্জ্য দিয়ে বোজানো হয়েছে নদীখাত। ওই নদীখাতে গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল, রেস্তোরাঁ। এই সব কারণে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমেছে। পাহাড়ের ঢালেও তৈরি হয়েছে বসতি, পর্যটনকেন্দ্র। আগস্ট মাসের অতিরিক্ত বৃষ্টিতে নয়, কেরলের এই বীভৎস বন্যা পরিস্থিতি অনেক আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল।  

ভয়াবহ বন্যার আভাস অনেক আগেই পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু কেরালা সরকার সে প্রস্তাব গ্রহণ করেনি, গ্যাডগিল কমিটির সুপারিশ মান্যতা পায়নি কেন্দ্রীয় সরকারেরও। উলটে কেন্দ্রীয় সরকার ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন বা ইসরোর ডিরেক্টর কৃষ্ণস্বামী কস্তুরীরঙ্গনের নেতৃত্বে অন্য একটি কমিটি গঠন করে। গ্যাডগিল কমিটি ৬৪ শতাংশ এলাকাকে পরিবেশের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিল, কস্তুরীরঙ্গন কমিটি তা ৩৭ শতাংশে নামিয়ে আনে। কিন্তু সেটুকুও কি কেরালা সরকার মেনেছে? না।

tapan3_082518012854.jpgবিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ এখন ত্রাণশিবির (রয়টার্স)

গ্যাডগিল কমিটি রিপোর্ট জানায়, পশ্চিমঘাট পর্বতগাত্রে যে ভাবে বসতি গড়া হচ্ছে, তা পুরোপুরি বন্ধই নয়,  যে সব বসতি গড়া হয়েছে,  সেগুলো থেকেও মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে দিতে হবে। নয়তো ভবিষ্যতে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। সুপারিশ কেবল কেরল নয়, পশ্চিম ঘাট পর্বতমালার পাদদেশের ছয় রাজ্য— তামিলনাড়ু,   কর্ণাটক, গোয়া, মহারাষ্ট্র, গুজরাটও অগ্রাহ্য করে। কেরালায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের অধিকাংশ ঘটেছে পাহাড়ের ধসে। পশ্চিমঘাট পাহাড়ে এমন ধস অতীতে কখনও হয়নি।

বন্যা বিপর্যয়ে কেরালার যে অঞ্চল সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, উত্তর ও মধ্য কেরলের সেই এলাকাগুলিকে ২০১১ সালেই পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকা বলে চিহ্নিত করেছিলেন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের গবেষক মাধব গ্যাডগিল। তাঁর দেওয়া সুপারিশগুলি মেনে নিলে এই বিপর্যয় থেকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও কেরলকে বাঁচানো সম্ভব হত। পাঁচ শতাধিক প্রাণহানি এবং লক্ষাধিক মানুষের ভিটেমাটি হারানোর একটি কারণ অবশ্যই অবিরাম বৃষ্টি, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়।

tapan1_082518012940.jpgত্রাণ শিবিরের পথে (রয়টার্স)

এই বিপর্যয়ের কারন হিসাবে অবশ্যই রয়েছে পশ্চিম ঘাট পর্বতমালার পাদদেশে নির্বিচারে নগরায়ণ, বাঁধ ব্যবস্থাপনায় অবহেলা, কেরালার নদীগুলোর দু’ধার বেদখল হয়ে যাওয়া এবং পূর্বাভাস জানানোর অক্ষমতা। কেরলে বন্যা পরিস্থিতির পূর্বাভাস দেওয়াও কঠিন বলে জানিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশন বা সিডব্লিউসি। ওই প্রতিষ্ঠান জানায়, দেশের অন্যত্র যেখানে দু’দিন আগে বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব, কেরলের ক্ষেত্রে সেটা তিন-চার ঘণ্টার বেশি সম্ভব হয় না। ভারী বর্ষার আগাম আভাস দেওয়া সম্ভব, এ ক্ষেত্রে সমুদ্রে মৎস্যজীবীরা বিপদ এড়াতে পারেন। কিন্তু বন্যা পরিস্থিতি বেশি আগে বলা সম্ভব নয়। কেরলে ২২টি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার তাই আগাম সতর্কতার ক্ষেত্রে যেমন অসহায় ছিল বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলাতেও ব্যর্থ।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

TAPAN MALLICK CHOWDHURY TAPAN MALLICK CHOWDHURY

The writer is a journalist.

Comment