পাকিয়ং বিমানবন্দর কেন সিকিমের বঙ্গ নির্ভরতা কমাবে
দেশের শততম বিমানবন্দরের ফলে সিকিমের পর্যটন ও অর্থনীতির উন্নতি হবে
- Total Shares
নাথু লার (লা = গিরিপথ) মাধ্যমে তিব্বতের সঙ্গে এবং ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের মাধ্যমে অবশিষ্ট ভারতের সঙ্গে -- সিকিমের যোগাযোগ বলতে এটুকুই। বড়জোর এর সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে দিনে চার-আসনবিশিষ্ট একটি হেলিকপ্টার। আগামী ৪ অক্টোবর অবশ্য পরিস্থিতি বদলে যাবে, প্রথম বাণিজ্যিক উড়ান যাতায়াত করবে এখান থেকে। আজ ২৪ সেপ্টেম্বর এই বিমানবন্দরের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এটি দেশের শততম বিমানবন্দর।
পাকিয়ং বিমানবন্দর উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (নিজস্ব চিত্র)
নাথু লার কথা বাদ দিলে বিশ্বের সঙ্গে সিকিমের যোগাযোগের এখনও পর্যন্ত একটিই পথ – ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক (পুরোনো হিসাবে ৩৫এ)। দক্ষিণে শিলিগুড়ি থেকে থেকে উত্তরে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক পর্যন্ত যাওয়ার এই একটিই মাত্র পথ। আর এই পথই সিকিমকে বারে বারে অবরুদ্ধ করেছে। পথ নয়, অবরুদ্ধ হয়েছে সিকিমের জীবন ও জীবিকা।
In the Pakyong Airport, Sikkim gets its first airport and India its one hundredth. Today is a momentous day for the aviation sector. Delighted to have inaugurated the airport in Sikkim. Come, visit Sikkim and experience the beauty and hospitality of the state! pic.twitter.com/fZ6ZxIitRj
— Narendra Modi (@narendramodi) September 24, 2018
দার্জিলিংয়ে আন্দোলন ও সিকিম
১৯৮০-র দশকের শেষ থেকে বারে বারে রক্তাক্ত হয়েছে দার্জিলিং। বারে বারে জনজীবন স্তব্ধ হয়েছে। তাতে সমস্যায় পড়েছে সিকিম। গত বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত ১০৪ দিন অবরুদ্ধ ছিল দার্জিলিং। পর্যটকরা ফিরে আসতে বাধ্য হন। আটকে পড়ে সিকিমগামী গাড়ি। সিকিমে যাঁরা গিয়েছিলেন তাঁরাও সমস্যায় পড়েছিলেন। পরের দিকে সিকিমের নম্বরপ্লেট লাগানো গাড়িগুলিকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
আইন অনুযায়ী জাতীয় সড়ক বন্ধ করা যায় না, কিন্তু আন্দোলনকারীরা কবেই আর আইন মেনেছে? সিকিমের যাঁরা গাড়িচালক, পর্যটকের অভাবে তাঁরা তো ভুগেইছিলেন, একই সঙ্গে ভুগতে হয়েছিল হোটেল ব্যবসায়ীদের। সিকিমের পর্যটকদের উপরে নির্ভর করে থাকে যে সব ব্যবসা – কুলি, স্থানীয় পরিবহণ, রেস্তোরাঁ এবং এমজি মার্গের দোকানগুলি, সমস্যায় পড়েছিলেন তাঁরাও। পর্যটক নেই মানে আয়ের রাস্তাও বন্ধ।
আগেও এমন ঘটেছে।
এই রাজ্যে রেলপথ নেই, প্রস্তাব আছে, কিন্তু সেই প্রস্তাব কবে বাস্তবায়িত হবে বা আদৌ হবে কিনা কেউ জানে না। তাই পর্যটননির্ভর এই রাজ্যটিকে পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ের আন্দোলনের শিকার হতে হয়েছে।
গোর্খা আন্দোলনের জেরে সমস্যায় পড়েছে সিকিম (পিটিআই ফাইল চিত্র)
যে সব ভ্রমণার্থী বাগডোগরা হয়ে সিকিমে যেতেন, তাঁদের ১৭৮ কিলোমিটার একমাত্র জাতীয় সড়ক ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। এখন তুলনায় কম খরচে কলকাতা থেকে তাঁরা সরাসরি পৌঁছে যেতে পারবেন গ্যাংটক, ভায়া পাকিয়ং বিমানবন্দর। পাকিয়ং থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ৩৩ কিলোমিটার।
আপাতত কলকাতা, দিল্লি ও গুয়াহাটি থেকে দৈনিক ৭৮ আসনের বিমান বোম্বার্ডিয়ার বিমান চালাবে স্পাইসজেট। পরে চাহিদা অনুযায়ী উড়ানের সংখ্য়া বাড়তেও পারে। এর ফলে পুরোপুরি না হলেও বাংলার উপর থেকে কিছুটা নির্ভরতা কমবে সিকিমের।
সিকিমের লাভ
তিনটি উড়ানে সর্বাধিক ২৩৪ জন প্রতিদিন সিকিমে যেতে পারবেন, এটা খুব কম কথা নয়। এই সব যাত্রীদের পাকিয়ং থেকে গ্যাংটক নিয়ে যাওয়ার জন্য ও গ্যাংটক থেকে পাকিয়ং পৌঁছে দেওয়ার জন্য একদল ট্যাক্সি বা গাড়ি চালককে আর পশ্চিমবঙ্গের উপরে নির্ভর করতে হবে না।
পাকিয়ং বিমানবন্দরের যে সব ছবি দেখা যাচ্ছে তাতে এই বিমানবন্দরটি নিজেই পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। গত বছর সিকিমে বেড়াতে গিয়ে দেখেছি যে নির্মীয়মান এই বিমানবন্দর নিয়ে রাজ্যের বাসিন্দারা যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁরা পর্যটকদের সে ব্যাপারে বলছিলেন।
এই বিমানবন্দরটি নিজেই পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে (পিআইবি)
এই বিমানবন্দরের যদি যাত্রীর সংখ্যা বাড়ে, অন্য উড়ান সংস্থাগুলিও আগ্রহী হবে, তাতে দিনে দিনে যাত্রীর সংখ্যাও বাড়তে থাকবে। তাতে সিকিমের গাড়ির চালকরা শিলিগুড়ির উপর থেকে নির্ভরতা কমাতে শুরু করবেন। কম সময়ে তাঁরা বেশি রোজগার করতে পারবেন।
কম সময়ে সিকিমে পৌঁছানো গেলে স্বাভাবিক কারণেই পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে, তাতে হোটেলগুলিরও লাভ বাড়বে। গ্যাংটকে বরফ পড়ছে শুনে হয়তো কেউ বিমানের টিকিট কেটে সিকিমে চলে গেলেন!
Serene and splendid! Clicked these pictures on the way to Sikkim. Enchanting and incredible! #IncredibleIndia pic.twitter.com/OWKcc93Sb1
— Narendra Modi (@narendramodi) September 23, 2018
পর্যটনের ব্যাপারে সিকিম যত বাংলার উপর থেকে নির্ভরতা কমাবে তাতে সিকিম ও পর্যটক – উভয়েরই লাভ হবে।
পর্যটকদের লাভ
১০ নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে মূলত দুই ধরনের নম্বরপ্লেট ওয়ালা গাড়ি চলে, সিকিমের ও পশ্চিমবঙ্গের। তিন নম্বরে রয়েছে নেপালের গাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের নম্বরপ্লেট ওয়ালা গাড়ি করে সিকিমে গেলে তারা বাড়তি ভাড়া নিয়ে নেয়, কারণ সেখান থেকে যাত্রী পেতে সমস্যা হয়। যাত্রী পেয়ে গেলে কিছুটা কম টাকা তারা নেয় বটে, তবে তেমন গাড়ি পাওয়া যাত্রীদের কপালের ব্যাপার। আবার উল্টোটাও হয় সিকিমের গাড়ির ক্ষেত্রে। তাই যে সব যাত্রী বাগডোগরা হয়ে সিকিমে যেতেন তাঁদের খরচ কমবে, সময়ও বাঁচবে। এমনও হতে পারে গ্যাংটক অচিরেই উইকএন্ড পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠল।
PM @narendramodi inaugurates Sikkim's first-ever airport which will improve connectivity and benefit the people of #Sikkim.Spread over 201 acres and located on top of a hill, the airport stands at 4,500 feet above sea level. #PakyongAirport ➡️https://t.co/mTJVv23KNF … pic.twitter.com/S3X18kxws2
— PIB India (@PIB_India) September 24, 2018
যাত্রার সময় কমলে লোকে বেশি দিন পর্যটনকেন্দ্রে থাকতে পারবে, তাতে হোটেল ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের যেমন লাভ হবে তেমনি পর্যটকদেরও লাভ।
বাংলার ক্ষতি
আজ বিমানবন্দর চালু হয়ে গেল মানে কাল থেকে শিলিগুড়ির অর্থনীতি ভেঙে পড়বে এমন নিশ্চয়ই নয়। তবে সিকিমের যত বাংলা নির্ভরতা কমবে সিকিমগামী গাড়ির চালকদের কাজও ততই কমবে, তাঁদের অন্য রুট খুঁজে নিতে হবে।
সিকিমগামী রাস্তায় যাত্রীর সংখ্যা কমলে ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারের হোটেলগুলিরও অতিথির সংখ্যা কমবে। তাতে সামান্য হলেও তাদের ক্ষতি হবে, অন্তত এখন থেকেই ক্ষতি শুরু হবে।
নতুন বিমানবন্দর
২০০৯ সালে এই বিমানবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও ৯৯০ একর জমির উপরে তৈরি এই বিমাবন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণে সময় লাগায় এত দিন হয়ে গেল তা প্রত্সুত হতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ ৪৫০০ মিটার উপরে অবস্থিত এই বিমানবন্দর নির্মাণ করতে ৬০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। চিন থেকে এর দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার।
সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বিমানবন্দরের নির্দেশক আর মঞ্জুনাথ বলেছেন, পাহাড়ের খাঁজ ব্যবহার করে ‘কাট অ্যান্ড ফিল’ পদ্ধতিতে এই বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে।
এক কথায় এই বিমানবন্দর সিকিমের পর্যটন এবং অর্থনীতিকে ইতিবাচক বদলের দিকেই নিয়ে যাবে।

