বার্ধক্যের রোগ অ্যালঝাইমার্স সম্বন্ধে তিরিশের গোড়াতেই সতর্ক হন
বার্ধক্যের অসুখ নিয়ে এখন ভেবে লাভ কী...তাই না?
- Total Shares
সেপ্টেম্বরকে অ্যালঝেইমার্স সচেতনতা মাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলে সম্প্রতি আমাদের ক্লিনিকে অ্যালঝাইমার্স নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা রোগটি সম্বন্ধে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল রোগটির বিষয় সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং মনের স্বাস্থ্যের ব্যাপারটা যে কোনও সামাজিক অস্বস্তির কারণ নয় সেটাও বলা।
এইমস-এর স্নায়ুরোগ বিভাগের অধ্যাপক যিনি দিল্লির অ্যালঝাইমার্স অ্যান্ড রিলেটেড ডিসঅর্ডার সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার প্রধান চিকিৎসক মঞ্জরী ত্রিপাঠী রোগটি সম্পর্কে এবং রোগীটিকে কী ভাবে গোড়াতেই চিহ্নিত করা সম্ভব আলোচনা করেন। পাশাপাশি রোগটির প্রতিকার নিয়েও আলোচনা করেন। স্মাইল স্টুডিয়োর সিইও চিকিৎসক একতা চড্ডা বলেন একজন ব্যক্তি যখন নিজের দাঁত মাজতে ভুলে যান কিংবা ব্যক্তিগত পরিছন্নতা সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে পড়েন তখন বুঝতে হবে যে সেই ব্যক্তির মধ্যে রোগটির উপসর্গ বলে চিহ্নিত করতে হবে। কোন খাবার আমাদের মস্তিস্ককে সজাগ এবং সুস্থ রাখতে সাহায্য করে তা নিয়ে আমি আলোচনা করি।
আলোচনার সময় আমি যখন হলুদ, আখরোট, ডিম, দই এবং দারচিনি প্রভৃতি খাবারের উপকারিতা সম্বন্ধে কথা বলছিলাম তখন অনুভব করি যে খাবারের উপকারিতা এবং সুস্থ মস্তিস্ক পেতে সুপারফুডের ভূমিকা সমন্ধে জেনে রাখা প্রয়োজন। তবে পুষ্টিকর খাবারদাবার যা আমাদের মস্তিস্ককে সুস্থ রাখে এবং আমাদের মস্তিস্ক যাতে অসময়ে বিকল হয়ে না পড়ে সেই বিষয় সাধারণ মানুষকে সচেতন করা অনেক বেশি প্রয়োজনীয়।
আখরোট খেলে মস্তিস্ক ভালো থাকে
এগুলি বিভিন্ন স্নায়ুর সমস্যা যেমন অ্যালঝাইমার্স এবং অন্যান্য বহু স্নায়ুর সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে। স্নায়ুর বিভিন্ন সমস্যাকে আগে ডিমেনশিয়া বলে চিহ্নিত করা হত। এটি এমন একটি অসুখ যার চিকিৎসা নেই এবং খুব দ্রুত মস্তিষ্কের কোষগুলো নষ্ট হতে থাকে এবং স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যায়, বাকশক্তি বিঘ্নিত হয়, একজন ব্যক্তি তাঁর চিন্তা শক্তি হারিয়ে ফেলেন, বিচার-বিবেচনা করার শক্তি হারায়, মেলামেশা করতে পারেন না এবং পড়ার বা লেখার ক্ষমতা হারান।
যাঁরা আলোচনাটা শুনছিলেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই এই কথাগুলো জানেন। কিন্তু এসব নিয়ে বড় একটা কেউ মাথা ঘামান না।
বার্ধক্যের অসুখ নিয়ে এখন ভেবে লাভ কী, তাই না?
ভুল!
সম্প্রতি যে সব গবেষণা হয়েছে তার থেকে উঠে এসেছে যে, যেসব রোগের কারণে আমাদের মানসিকর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে সেগুলোকে এড়াতে তিরিশ পেরোতে না পেরোতেই সতর্ক হতে হবে। যে সব রোগের চিকিৎসা এখনও তেমনভাবে বেরোয়নি সেসব রোগের প্রতি আমাদের প্রথম থেকেই সচেতন হতে হবে। আমারদের এও জানা নেই যে কী ভাবে মস্তিষ্কের ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। এখনও পর্যন্ত আমরা শুধু কয়েকটা ওষুধ সম্পর্কে জানি যা মস্তিষ্কের ক্ষয়ের গতি কিছুটা হলেও বিলম্বিত করতে পারে কিন্তু তা সম্পূর্ণ ভাবে রুখতে পারে না। তাই এ ধরণের রোগের সম্পর্কে সময় থাকতে সচেতন হওয়াটাই একমাত্র উপায়।
মস্তিস্ক সুস্থ রাখতে প্রোটিনের একটা বড় ভূমিকা আছে
এইধরণের রোগের থেকে মুক্ত থাকতে পুষ্টির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। এখানে প্রোটিনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও আছে। প্রোটিনে যে অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে তা মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা নিউরোট্রান্সমিটারকে সুস্থ রাখে। নিউরোট্রান্সমিটার আমাদের মস্তিস্ককে সজাগ রাখতে সহায়তা করে। তাই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।
ফ্যাটি অ্যাসিডের ভূমিকাও অনেক। মাছ থেকে আমরা ওমেগা-৩ পাই। মস্তিস্ক ভালো রাখতে ওমেগা-৩র একটা বিরাট ভূমিকা আছে, আমাদের শরীরে ওমেগা-৩ তৈরি হয় না। ওমেগা-৩ স্মৃতিশক্তি ভালো রাখে। যাঁরা নিরামিষাশী তাঁরা ওমেগা-৩র জন্য আখরোট ও তিসি বীজ খেতে পারেন।
মাছ থেকে আমরা ওমেগা-৩ পাই
শরীরে ভিটামিন ডি-র মাত্রা কম হলে স্মৃতি শক্তি দুর্বল হয়। শরীরের ভিটামিন ডি-র অভাব আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
যাঁদের শরীরে ভিটামিন ডির মাত্রা ৫০ এনএমওএল-এর বেশি তাঁদের স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে। ভারতীয়দের মধ্যে ভিটামিন ডির অভাব দেখা যায়। তাই শরীরে ভিটামিন ডির অভাব আছে কী না সেটা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। শরীরে ভিটামিন ডির অভাব থাকলে ঠিকঠাক খাবারদাবার এবং সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে।
তাই প্রত্যেকদিন যদি আমরা মিনিট ১৫-২০ সূর্যের আলোতে দাঁড়ায় তাহলে শরীরে ভিটামিন ডি সংশ্লেষ হয়।
মস্তিস্ককে সজাগ রাখতে ভিটামিন ই-র ভূমিকায় অনেক। বাদাম, তরতাজা শাকসবজি, এস্পারাগাস, জলপাই, ডিম এবং ব্রাউন রাইসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই থাকে।
রোজ মিনিট ১৫-২০ সূর্যের আলোতে দাঁড়ালে শরীরে ভিটামিন ডি সংশ্লেষ হয়
তবে ডিমেনশিয়া এবং অ্যালঝাইমার্স রুখতে ভিটামিন বি-১২ (কোবালামিন)-এর কোনও ভূমিকা আছে কী না তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি। যদিও মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলিকে এবং মস্তিষ্কের লোহিত রক্ত কণিকাকে সচল রাখতে এর ভূমিকা প্রমাণিত। ভিটামিন বি-৬, বি-১২ ও ফলিক অ্যাসিড একত্রে কাজ করে রক্তে হোমোসিস্টেইনের মাত্রা কম রাখে। রক্তে হোমোসেস্টিনের পরিমাণ বেশি থাকলে এই ধরণের সমস্যা দেখে দেয়।
বাদাম, তরতাজা শাকসবজি, এস্পারাগাস, অলিভ, ডিম এবং ব্রাউন রাইসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই থাকে
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-এরও অনেক উপকারী। যত বেশি তরতাজা শাকসবজি এবং ফলমূল খাওয়া যাবে ততই মস্তিস্ক ভালো থাকবে। তাই গাজর, ফুলকপি, ব্রকোলি, বাঁধাকপি, পালংশাক, মাশরুম ও বেরি জাতীয় ফল খান।
শরীরের ওজনের দিকে নজর রাখুন এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। একদিকে যেমন ভুঁড়ি বাড়ে অন্যদিকে তেমন মস্তিস্ক সঙ্কুচিত হতে থাকে। স্থূলতার সঙ্গে মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস অংশটির আকারে সংকুচিত হওয়ার একটা যোগাযোগ রয়েছে। কোনও কিছু মনে রাখতে বা স্মৃতিশক্তি ঠিক রাখতে সাহায্য করে হিপ্পোক্যাম্পাস।
নিয়মিত মাশরুম খান
রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখুন এর ফলে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থেকে যা স্মৃতিশক্তি ঠিক রাখে। তাই এবার থেকে যখন অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খাবেন বা অতিরিক্ত গ্লাইসেমিক যুক্ত খাবার খাবেন তখন সচেতন থাকুন। কারণ এই জাতীয় খাবার বেশি পরিমাণে খেলে মস্তিস্ক এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
লেখাটা ইংরেজিতে পড়ুন

