শিকাগোতে অনুষ্ঠিত হতে চলা বিশ্ব হিন্দু মহাসভা কেন গুরত্বপূর্ন
বিশ্বজুড়ে হিন্দুদের সমস্যা সনাক্ত করে সমাধানসূত্র খুঁজে বের করাই এই মহাসভার মূল লক্ষ
- Total Shares
১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মকালের কথা। দিনটা ৩০শে জুলাই ছিল। শিকাগো রেকর্ড (সেই বছরের ১১ই সেপ্টেম্বরের) অনুযায়ী, "সে দিন কমলা রঙের পাগড়ি ও একই রঙের ফতুয়া পরিহিত এক সুদর্শন, সুপুরুষ ও শিক্ষিত ব্রাহ্মণ হিন্দুর আবির্ভাব ঘটেছিল শিকাগোতে"। সেই "বুদ্ধিদীপ্ত" চেহারার ইংরেজিতে বেশ "পারদর্শী" লোকটির নাম স্বামী বিবেকানন্দ। সেই বছরের ৩১শে মে ভারত থেকে জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করতে।
স্বামী বিবেকানন্দ যখন চিকাগো গিয়ে ছিলেন ভারতবর্ষে তখন ইংরেজ শাসন - সর্বস্বান্ত, ক্ষত ও সবদিক থেকে ভেঙ্গে পড়া একটি রাষ্ট্র।
একসময়কার সমৃদ্ধশীল ও প্রাচুর্যপূর্ণ ও বরাবরই বিজ্ঞান মনষ্ক দেশটি, পানিনি, আর্যভট্ট, বেদ ও পতঞ্জলির দেশ সেই ভারতবর্ষ, বহু যুগ ধরে বিদেশী আক্রমণকারীদের হাতে লুন্ঠিত হতে হতে এবং বিদেশী শাসকদের চাপে, তখন দিশেহারা এবং সহায় সম্বলহীন। আপামর ভারতবাসী তখন স্ফুলিঙ্গের প্রত্যাশায় অপেক্ষারত। বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে সেই স্ফুলিঙ্গ হিসেবে উদিত হয়েছিলেন স্বামীজী।
বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে স্বামীজী পরাধীন ভারতের হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করে ছিলেন
সেদিন তাঁর ভাষণের মাধ্যমে সনাতন হিন্দু ধর্মকে বিশ্বদরবারে উপস্থিত করেছিলেন তিনি। সেদিন স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর শ্রোতাদের বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন যে কী ভাবে হিন্দু ধর্মের একাধিকত্ব, সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ, ভালোবাসা ও সহানুভূতি, দর্শন, যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতা হিন্দু ধর্মকে মহান করে তুলেছে। বিশ্ব সভ্যতার সবচাইতে প্রাচীন না হলেও, অন্যতম প্রাচীন ধর্ম হল হিন্দু ধর্ম।
বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে স্বামীজীর বক্তৃতার ১২৫ বছর উদযাপনের জন্যে প্রায় ২,৫০০ প্রতিনিধি শিকাগোর দক্ষিণ পশ্চিম শহরতলি লম্বার্ডে দ্বিতীয় বিশ্ব হিন্দু মহাসভাতে যখন মিলিত হবেন তখন একটা কথা আমাদের মাথায় রাখতেই হবে - বিবেকানন্দ যে ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তার সঙ্গে বর্তমান ভারতের আসমান-জমিন ফারাক।
বৃটিশ শাসন অনেকদিন হল আর নেই। একশো কোটির ভারত এখন বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি ও বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উন্নয়নশীল। ইতিমধ্যেই, প্রথম চেষ্টাতেই মঙ্গলগ্রহে মহাকাশযান পাঠিয়ে বর্তমান ভারত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও অনেক কদম এগিয়ে গিয়েছে।
বর্তমান ভারতে সাংস্কৃতিক নবজাগরণ রচিত হচ্ছে। নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক মডেলকে পিছনে ফেলে ভারতে এখন পুঁজিবাদবিহীন বাজার অর্থনীতির উপর ঝুঁকেছে। নুরুল হাসানের সময়কার শিক্ষা ব্যবস্থা এখন অতীত। সব মিলিয়ে নতুন একটি ভারত তৈরি হচ্ছে - এবং হিন্দুরা সেই কর্মকান্ডের অন্যতম কারিগর।
এই প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্ব হিন্দু মহাসভা কিন্তু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনদিনের (সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখ থেকে শুরু হবে) এই সম্মেলনে প্রায় ২৫০ জন মতো শিক্ষাবিদ, লেখক, শিল্পী, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক নেতা ও দার্শনিক অংশগ্রহণ করবেন। প্রায় ২,৫০০ প্রতিনিধি ৫০টিরও বেশি দেশ থেকে উপস্থিত থাকবেন। বলা হচ্ছে, "হিন্দু নেতাদের সবচেয়ে বড় সম্মেলন হতে চলেছে এই বিশ্ব হিন্দু মহাসভা।"
এই অনুষ্টানে সাংগঠনিক ও বিদায়ী বৈঠক ছাড়াও অর্থনীতি, শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, নারী সম্পর্কিত সমস্যা, রাজনীতি ও যুব বিষয়ক বিষয়গুলো নিয়ে বেশ কয়েকটি সামন্তরাল আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রথম বিশ্ব হিন্দু মহাসভা ২০১৪ সালে দিল্লিতে হয়ে ছিল [সৌজন্যে: বিশ্ব হিন্দু জনসভার ওয়েবসাইট]
আইআইটি খড়্গপুরের বিজ্ঞানের প্রাক্তনী স্বামী বিজ্ঞানন্দের মস্তিষ্কপ্রসূত এই বিশ্ব হিন্দু মহাসভার প্রধান লক্ষ গোটা বিশ্বে হিন্দুদের সমস্যাগুলো সনাক্ত করে সেগুলোর সম্ভাব্য সমাধানসূত্র খুঁজে বের করা। এই মহাসভা চার বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয় যার প্রথমটি ২০১৪ সালে দিল্লিতে হয়ে ছিল। আয়োজকদের একজন জানাচ্ছেন, "হিন্দুদের আধ্যাত্মিক ও অসাম্প্রদায়িক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু অন্যের সাহায্য ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই অসাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। বিশ্ব হিন্দু মহাসভা সেই অভাব পূরণের জন্যেই অনুঠিত হয়।"
অনেকেই তর্ক করেন যে হিন্দু সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে একত্রিত হয়ে থাকতে না পারা। বিভিন্ন ছোট ছোট সংগঠনে বিভক্ত হিন্দু ধর্ম আর প্রতিটি সংগঠনের নিজস্ব ভাবাদর্শ রয়েছে। গির্জা বা বামপন্থীরা যেমন একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাসী হিন্দু ধর্মালম্বীরা ঠিক সেরকম নয়। জেএনইউর অধ্যাপক মকরান্দ পরাঞ্জপের মতে হিন্দুরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। যে কোনও হিন্দুই একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর সদা খুঁজে বেড়ান: "আমি কে?"
জীবনাদর্শ নিয়ে হিন্দুরা একটি ভাবাদর্শের উপর বিশ্বাস করে থাকেন: "অহম ব্রহ্মাস্মি (জীবনের মধ্যেই ব্রহ্মা রয়েছেন)।"
এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা বেশ কিছু মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রায় শ'দুয়েক স্বেচ্ছাসেবী দিনরাত্রি কাজ করে চলছেন এই মহাসভাকে সাফল্যমন্ডিত করে তোলার জন্যে।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন দলাই লামা। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন আরএসএস নেতা মোহন ভাগবত, আর্ট ও লিভিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর, চিন্ময়া মিশনের নেতা স্বামী স্বরূপানন্দ, নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অরবিন্দ পানগোরিয়া, লেখক মধু কিশ্বর, ওয়ালমার্টের ভাইসপ্রেসিডেন্ট ড্যান ব্রায়ান্ট, অভিনেতা পদ্মভূষণ অনুপম খের, সেন্সর বোর্ডের সদস্য ভিভেক অগ্নিহোত্রী সহ আরও অনেক বিশিষ্ঠজন।
এই ধরণের মহান প্রয়াসের একটি খারাপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন যে প্রায় ৫,০০০ বছর ধরে চলে আসা হিন্দুধর্মের কিছু বৈশিষ্ট এর ফলে নষ্ট হতে পারে। অন্যদের মতো, অন্যের বিরুদ্ধে একত্রিত করে তোলার জন্যে এই হিন্দু মহাসভা আয়োজন করা হচ্ছে না তো? যারা ভয় পাচ্ছেন তাঁরা আবার এটাও মনে করছেন যে হিন্দুরা এতো তাড়াতাড়ি নিজেদের পরিবর্তন করতে পারবে না।
পারবে কি পারবে না এর উত্তর একমাত্র সময়ই দিতে পারবে।
লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

