দলবদল ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: জনগণ কী ভাবছে

সেই দিনের পর মোদী-শাহের বিরুদ্ধে তদন্ত কারা কী ভাবে চালাবে?

 |  5-minute read |   08-02-2019
  • Total Shares

আজকের এই লেখার অবতারণা এক-দুই করে কয়েকটি বিষয়ের দিকনির্দেশ করা – যেগুলি সাম্প্রতিক কালে মানুষের মধ্যে কথাবার্তা হচ্ছে কিন্তু হইচইমূলক সংবাদের চাপে আলোচনার সুযোগ হচ্ছে না। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে।

এটা ঠিক যে মানুষের মনে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি নিয়ে অনেক কৌতূহল থাকে – সব সময় সেই কৌতূহলগুলো মেটে না, অথবা সেই কৌতূহলগুলো  মেটাতে যত দূর পর্যন্ত পৌঁছনো প্রয়োজন ততদূর পৌঁছনো সম্ভব হয় না।

বিষয় ১:

দু’একদিন আগে কংগ্রেসের সদর দফতরের সামনে কয়েকটি দলীয় হোর্ডিং লাগানো হয়েছিল এবং স্থানীয় পুরসভার পক্ষ থেকে সেই হোর্ডিংগুলো সরিয়ে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

কৌতূহল সেই হোর্ডিং লাগানো বা তা সরিয়ে দেওয়া নিয়ে নয়, কৌতূহল সেই হোর্ডিংয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে। শোনা যাচ্ছে সেই হোর্ডিংয়ে তিন জনের ছবি ছিল – রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ওয়াধেরা এবং রবার্ট ওয়াধেরা। কৌতূহলটা এখানেই। আনুষ্ঠানিক ভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে সংযুক্ত কোনও ক্ষেত্রে রবার্ট ওয়াধেরার কোনও ছবি কি এখনও ছাপানো হয়েছে, যদি তা না হয়ে থাকে তা হলে এবারে কেন তা ছাপানো হল? নিন্দুকরা বলছেন যে, প্রিয়াঙ্কা ও রবার্টের বিবাহের পর থেকে অত্যন্ত সযত্নে রবার্ট ওয়াধেরাকে দলীয় স্তরের বাইরে রাখা হয়েছে। এটা তাঁর নিজের ইচ্ছাতেও হতে পারে। রবার্ট একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবেই থেকেছেন।

robert_020819092153.jpgপোস্টারে রবার্ট ওয়াধেরা (ছবি: এএনআই, টুইটার)

সময়ে সময়ে প্রিয়াঙ্কার নাম এসেছে, তিনি কয়েকটি রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে যোগও দিয়েছেন, কিন্তু রবার্ট কোনও ভাবেই নয়। কিন্তু এখন কেন?

এর উত্তর পাওয়া কঠিন, সেই স্তর পর্যন্ত মানুষের পৌঁছানোর কোনও সুযোগ নেই, কিন্তু একটা পাল্টা আলোচনায়ও কান পাতলে কোনও কোনও জায়গায় শোনা যাচ্ছে।

স্বাধীন ভারতে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা তার সম্পর্কিত কোনও ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনও অভিযোগ এলেই সেখানে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ নামের পাল্টা অভিযোগ বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এটা দলমত নির্বিশেষে স্বাধীন ভারতের দুর্ভাগ্য।

রবার্টের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের তদন্ত আপাতত বেশ চরম পর্যায়ে রয়েছে। তা হলে এখানেও কি সেই ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ তত্ত্বটিকে খাড়া করার জন্য তাঁর পত্নী এখন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং তাঁর ছবি এখন দলীয় পোস্টারে জায়গা পাচ্ছে?

বিষয় ১-এর শেষ প্রশ্ন, এটি দল বাঁচাও অভিযান নাকি পরিবার বাঁচাও অভিযান?

বিষয় ২

জাতীয় থেকে একেবারে রাজ্যস্তর। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছে বিজেপি। এই বিজেপির একটি ছোট্ট পরিষদীয় দল আছে। সাধারণ ভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যে, কোনও বৃহৎ জাতীয়, সামাজিক বা অর্থনৈতিক বিষয় না থাকলে বিধানসভা বা লোকসভাতে সরকারের আনা বিভিন্ন বিলের যুক্তিসঙ্গত বিরোধিতা করাই বিরোধী দলের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি পরিষদীয় দলের ভূমিকা তেমন ভাবে সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়েনি, কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে নিন্দুকদের মধ্যে।

পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন। নীতিগত ভাবে তৃণমূল সরকারের এই প্রচেষ্টার বিরোধী বিজেপি এমনকি আরএসএস-ও। এই বিরোধিতা কী এবং কেন – তা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু বিধানসভার ভিতরে দাঁড়িয়ে এই বিল সমর্থন করেছে বিজেপি পরিষদীয় দল। শুধু একটা নয়, বিজেপি পরিষদীয় দল সমর্থন করেছে বিশ্ববঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় বিলকে, যেখানে তাঁদেরই দলের এক নেতা এই বিশ্ববঙ্গ বিষয়টি নিয়ে মামলা করে সংবাদের শিরোনামে এসেছিলেন।

তৃতীয়ত, কলকাতা শহরের নতুন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সময় পুর আইনে যে বদল আনা হয়েছিল, তাকেও সমর্থন করেছিল বিজেপি পরিষদীয় দল। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা মোদীভাই ও দিদিভাই তত্ত্ব নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মাথা খাচ্ছেন। সেই তত্ত্বের সঙ্গে বিজেপির পরিষদীয় দলের এই ভূমিকা নিন্দুকদের ভাবাচ্ছে।

বিষয় ৩

সারা ভারত সম্প্রতি কলকাতার মেট্রো চ্যানেলের একটির ধর্নার দিকে নজর রেখেছিল। যে বিষয়কে সামনে রেখে এই ধর্না, সেই বিতর্ক শুরু হয়েছে প্রায় ৬ মাস আগে থেকে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির অপব্যবহার এবং অবমাননা।

অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত বিতর্ক।

কিন্ত নিন্দুকেরা ঠিক একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না, এমনকি যে নিন্দুকেরা নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহকে চূড়ান্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ ও দুর্নীতিপরায়ণ বলে মনে করেন।

modi-shah-uday-embed_020819092309.jpgনরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ। প্রতিহিংসা পরায়ণ? (ডেইলিও)

২০১৯ সালের নির্বাচনের যেদিন ভোট গণনা সেদিন দুপুর একটার সময় নিশ্চিত হয়ে যাবে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরছেন কি ফিরছেন না। ঘটনাচক্রে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ দু’জনেই গুজরাটের এবং গুজরাটে সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচন তাঁদেরই দল ক্ষমতায় এসেছে। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের দল আগামী ৫ বছর ক্ষমতায় থাকবে। গণনার দিন দুপর একটার পরে পরিস্থিতি বুঝে এই দুই ব্যক্তিত্ব দিল্লি থেকে উড়োজাহাজে করে গিয়ে আমেদাবাদে যান এবং আশ্রয় নেন, তা হলে আজকের প্রেক্ষাপটে সেই দিনের পর থেকে এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত কারা চালাবে এবং কী ভাবে চালাবে। কারণ তখন বিজয় রুপানির পুলিশ বলবে, কেন্দ্রীয় সংস্থার প্রতিনিধিদের হয় আরব সাগরে ছুড়ে ফেলা হবে না হয় কচ্ছের রানে গিয়ে ছুড়ে ফেলা হবে।

বিষয় ৪

গত প্রায় ১০০ বছর ধরে ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় স্বংয়সেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস নামে একটি সংগঠন আছে। এই সংগঠনের বেঁচে থাকা এবং বিস্তারের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ কৃতিত্ব অসংখ্য সর্বসময়ের কর্মী, যাঁদের প্রচারক বলা হয়।

প্রাচীন যুগের বামপন্থী সংগঠনগুলোর মতোই দশকের পর দশক ধরেপ এই প্রচারকরা নিজেদের জীবন এই সংগঠনকেই উৎসর্গ করে থাকেন। পরবর্তী কালে যখন সঙ্ঘ পরিবারের অংশ হিসাবে রাজনীতির সংগঠন বেড়ে উঠেছে, তখন এই রকমই প্রচারকদের মধ্যে কিছু রাজনীতিমনস্ক ও রাজনীতি সচেতন প্রচারকদের তৎকালীন জনসঙ্ঘ বা আধুনিক বিজেপিকে কাজে লাগানো হয়। আজকের নরেন্দ্র মোদী সেই রকমই একটি ব্যক্তিত্ব।

সাধারণ ভাবে এই ব্যক্তিদের তেমন কোনও চারিত্রিক পদস্খলন প্রকাশ্যে আসেনি। সাম্প্রতিক অতীতে বিতর্ক হয়েছে গোবিন্দাচার্য্যকে নিয়ে অথবা সঞ্জয় জোশীকে নিয়ে। কিন্তু বাস্তব যাই হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো ঘটনা কোনও দিন ঘটেছে বলে নিন্দুকেরা মনে করতে পারছেন না।

amalendu_020819092453.jpgকংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন অমলেন্দু চট্টোপাধ্যায়। (ছবি: ডেইলিও)

বিজেপির রাজ্যস্তরে থাকা এরকম এক প্রচারক, যিনি আরও কয়েকজন একই ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং একই কারণে গ্রেফতার হয়ে জামিনে মুক্ত। সেই ব্যক্তি কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দলে যোগদান করেছেন। আরএসএসের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে কোনও নিন্দুক মনে করতে পারছেন না।

কী এবং কেন! সেই স্তর পৌঁছনো যথারীতি সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

বিষয় ৫

ভারতের নিন্দুকেরা আরও একটা বিষয়ে বিভ্রান্ত, তা হল দলবদলের রাজনীতি। কে কখন দল বদল করেন, কেন করেন – সাধারণ মানুষ নন, নেতারা – এই অঙ্কটা নিন্দুকরা বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু বুঝে উঠতে পারেন না।

পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে একটা সময় মানস ভুঁইয়া নিজেকে মহাত্মা গান্ধীর পরে দ্বিতীয় নিবেদিতপ্রাণ কংগ্রেস বলে দাবি করতেন। তিনি এখন অন্য দলের রাজ্যসভার সাংসদ।

manaspti_020819092748.jpgকংগ্রেস ছেড়ে মানস ভুঁইয়া এখন তৃণমূল কংগ্রেসে। (পিটিআই)

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা পরিবর্তনের ফলে শাসকদলের কোনও এক নেতৃত্বে সারা পশ্চিমবঙ্গে দলবদলের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এখন তিনি অন্য দলেরর শীর্ষ নেতা হিসাবে একই রকম ভূমিকা পালন করছেন।

মালদহের ঐতিহ্যবাহী পরিবারের কংগ্রেসি ব্যক্তিত্বরা দলবদলের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এই দলবদলের রাজনৈতিক খেলাটাকে নিন্দুকেরা রসিকতা করে হাওয়ামোরগ বলেন, কেন্দ্রীয স্তরে এরকম বেশ কিছু ব্যক্তিত্ব আছে যাঁরা এরকম দলবদলের অঙ্ক কষে বছরের পর বছর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে গেছেন।

mukul_020819092817.jpgতৃণমূল থেকে বিজেপিতে মুকুল রায়। (ডেইলিও)

উত্তরপূর্ব ভারতে এরকম দলবদল ইদানীং কালে সমস্ত রাজনৈতিক দলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দলবদলও নিন্দুকদের কাছে কৌতূহল এবং উত্তর না পাওয়া প্রশ্ন।

রাজনীতি আছে, থাকবে। সমাজ এবং অর্থনীতিও আছে এবং থাকবে। কিন্তু চায়ের দোকানে অথবা চণ্ডীমণ্ডপে অথবা বাড়ির বৈঠককানায় টেলিভিশন দেখতে দেখতে নিন্দুকদের মনে এই জাতীয় অনেক কৌতূহল এবং প্রশ্ন আছে এবং থাকবে। কিন্তু ওই যে বললাম, এই কৌতূহলের অবসান করতে গেলে অথবা এই জাতীয় প্রশ্নের উত্তর কপেতে গেলে যে স্তর পর্যন্ত পৌঁছান দরকার, সেখানে পৌঁছানো নিন্দুকদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর হইচইমূলক সাংবাদিকতার কারণে এই জাতীয় প্রশ্ন বা কৌতূহলের গোড়ায় পৌঁছানোর সময় বা সুযোগ হয় না।

Writer

PRASENJIT BAKSI PRASENJIT BAKSI @baksister

The writer is a veteran journalist.

Comment