স্বয়ং নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট, তা হলে গণতন্ত্র এখন কোন পথে

নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করা কেন, জনগণের উপরে ভরসা নেই রাজনৈতিক দলগুলোর?

 |  3-minute read |   04-05-2018
  • Total Shares

দেশের সংসদ হোক বা গ্রামপঞ্চায়েত, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের মন্দিরে যাঁরা জনপ্রতিনিধিদের পাঠান, তাঁরা পক্ষপাতদুষ্ট হলে কী হয়, তা এখন দেখছে পশ্চিমবঙ্গ। তাই পঞ্চায়েতের মতো একটা পাড়া-পর্যায়ের নির্বাচনও এখন দেশের খবরের শিরোনামে। জনপ্রতিনিধিত্বের জন্য যাঁরা লড়াই করেন, তাঁদের শেষ বিচারক নির্বাচন কমিশনই, তাঁদের অভাব-অভিযোগের নিষ্পত্তির দায়িত্বও সেই কমিশনের উপরেই বর্তায়। কিন্তু এখন সেই কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভূমিকাই আদালতের প্রশ্নের মুখে। বিচারের শেষ রায় যাই হোক, আদালত এখনও নির্বাচন কমিশেনের কাজে হস্তক্ষেপ করতে রাজি নয়।

সময়মতো নির্বাচন শেষ করার অর্থ এই নয় যে যেমন খুশি তেমন ভাবে চলবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা যাবে না, তাও নয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের উপরেই দাঁড়িয়ে দেশের গণতন্ত্র। মোটামুটি এই ভাষাতেই শুক্রবার রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করল কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বিশ্বনাথ সমাদ্দার ও বিচারপতি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের বেঞ্চ। একই সঙ্গে দুই বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারে হস্তক্ষেপ করতে চায় না।

highcourt_body_050418072313.jpgআদালত অসন্তুষ্ট রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায়

বিচারবিভাগ বনাম নির্বাচিত সরকার – এ নিয়ে আমাদের দেশে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। অনেকটা মিশরের ফারাও উপরে নাকি পুরোহিত উপরে, এই গোছের তর্ক। কিন্তু এই মামলায় আদালত অন্তত একটা বিষয় স্পষ্ট করে দিতে পেরেছে, তারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করতে চায় না, শুধুমাত্র বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়টুকু দিতে চায়।

আইন তৈরি করে দেশের বা রাজ্যের আইনসভা, যা সংসদ ও বিধানসভা নামে পরিচিত। কারা আইনপ্রণেতা হবেন, তা নির্বাচনের মাধ্যমে স্থির করার অধিকার জনগণের। নির্বাচন প্রক্রিয়া এমন একজন পরিচালনা করেন, যিনি প্রশাসনের ঊর্ধ্বে, অর্থাৎ অনেকটা বিচারবিভাগের মতো, যার উপরে সাধারণ মানুষের আস্থা না রেখে উপায় নেই। যদি সেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে, তা হলে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাই তো থাকবে না।

রাজ্য থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ভাবলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হবে। রাজ্যের শাসক দলের মতো দেশের নির্বাচন কমিশনও যদি কোনও দিন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, তা হলে তো দেশে একদলীয় শাসন চিরকালের জন্য কায়েম হতে পারে, যা গণতন্ত্রের বিনাশ ডেকে আনবে।

গণতন্ত্রের যে সব স্তম্ভের কথা বলা হয়, তার মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে ধরা হয় না ঠিকই, কিন্তু দেশের জনগণের প্রতিনিধিদের গণতন্ত্রের মন্দির পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব এই নির্বাচন কমিশনের হাতেই থাকে। তাই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য একক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং চাপের কাছে মাথা নোয়ান না, এমন নির্বাচন কমিশনই চান ভোটদাতারা। তাই ভোটের ফল যাই হোক, মীরা পাণ্ডের অধীনে নির্বাচনের পরে শাসক-বিরোধী কেউ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলতে পারেনি।

election_body1_050418072455.jpgগণতান্ত্রের দাবিতে পথে

নির্বাচনের দিন ঘোষণা ইস্তক রাজ্যে যে হিংসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দেওয়ার কার্যত কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি রাজ্য নির্বাচন কমিশনার অমরেন্দ্র সিংয়ের। তা ছাড়া প্রতিটি পদক্ষেপই তিনি করেছেন রাজ্যের শাসকদলকে খুশি করতে, অভিযোগ তেমনই। প্রথমে তিন দফায় নির্বাচনের কথা বললেও, পরে কী ভাবে এক দফায় তিনি তা সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করাবেন, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য তিনি নিরাপত্তার কী বন্দোবস্ত করছেন, সে সব প্রশ্ন রয়েই গিয়েছে। শুক্রবারের রায়ে নির্বাচন কমিশনকে তার আচরণ নিয়ে ঘুরিয়ে সতর্কও করেছে আদালত। একই সঙ্গে চাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে রায়ের ফোটোকপি দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।

দেশে সম্ভবত এই প্রথম নির্বাচনের দিন ঘোষণার পরেও গণনার দিন ঘোষণা করা হচ্ছে না। পরিস্থিতি এখন এমন, নির্বাচন কমিশনার হয়ত নিজেও নিশ্চিত নন যে কবে, ভোটগ্রহণ হবে তা নিয়ে। কিন্তু এই দায় কার?

প্রথম বার আদালতে ধাক্কা খাওয়ার পরে নির্বাচন কমিশনার বিতর্ক এড়াতে কয়েকটিমাত্র পদক্ষেপ করতেই পারত। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ পদক্ষেপ হল, যে যুক্তিতে প্রথমে তিন দফায় ভোট করানোর ঘোষণা করেছিলেন, সেই একই যুক্তিতে পরবর্তী কালেও তিন দফায় ভোট করানো এবং ভোটগ্রহণের সময় যাতে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা। শুধুমাত্র শাসকদলকে খুশি রাখার জন্য নতুন করে দিন ঘোষণার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করার দরকার ছিল না। তাতে নির্বাচন একট প্রহসনে পরিণত হত না। হিংসাও ছড়াত না।

নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা হারানো মানে গণতন্ত্র ধ্বংস করে শাসনকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেওয়া। আর নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাই বা কেন? জনগণের উপরে কি ভরসা নেই রাজনৈতিক দলগুলোর?

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment