বাম আমলের মতো এই আমলেও আদিবাসীরা তৃণমূল নেতা নেত্রীর ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে
জঙ্গলমহলে বজরং দল ও আরএসএসের পুরনো সংগঠন আছে, ৯২তে আদবানির রামরথ এখান দিয়ে যায়
- Total Shares
ভারতবর্ষে কোথাও জাত-পাতের নাম কোথাও বিশেষ কোনও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার রাজনীতি যেমন পুরোনো তেমনি পশ্চিমবঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক সংঘর্ষ থেকে ক্ষমতা অর্জনের ইতিহাস খুবই পুরোনো। পশ্চিমবঙ্গের আনাচে কানাচে জাত পাতের নামে খুনোখুনির ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে না যা এই মুহর্তে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে ঘটে চলেছে।
তবে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো কয়েক দশক ধরেই দেখিয়ে চলেছে রাজনৈতিক সংঘর্ষে শীর্ষ স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনেও পশ্চিমবঙ্গ তার সেই রেকর্ড ধরে রেখেছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দিন ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক সংঘর্ষে রক্ত ঝরা শুরু হয়েছিল রাজ্যে। ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্য জোট দিন গেছে বেড়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের ট্র্যাডিশন অনুযায়ী শাসক দলে আধিপত্যবাদী মানসিকতাও বেড়েছে। ফলে, পঞ্চায়েত নির্বাচনে কোথাও কোথাও বেগ পেতে হতে পারে এই উপলব্ধি থেকে বিরোধী শূন্য করার রাস্তা নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।
৯২তে আদবানির রামরথ এই এলাকা দিয়ে গিয়েছিল
এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে, বিশেষ করে রাজ্যের পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল এলাকায় আদিবাসী মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে মুখ ফিরিয়েছে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমান তাঁদেরকে দু'টাকা কেজি চাল, সাইকেল বা অন্যান্য ডোল দিয়েও দমিয়ে রাখা যায়নি। বাম আমলের মতো এই আমলেও তাঁরা তৃণমূল নেতা নেত্রীর ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। ফলে, পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম বেলপাহাড়ির মতো পুরুলিয়াতেও বলরামপুরে শাসক দলে ঘটি উল্টে দিয়েছেন আদিবাসীরা। তাঁদের ভোট গিয়েছে বিজেপির দিকে যা নিঃসন্দেহে বাংলার রাজনীতির মানচিত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
প্রত্যন্ত গ্রামীণ আদিবাসী এলাকায় বামপন্থী বা অতি বামপন্থীরাই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকে। ওই সমস্ত এলাকায় দক্ষিণ পন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখতে পাওয়া যায় না। এই কারণেই বামেদের উপর বিদ্বেষ বাড়ায় জঙ্গলমহলে অতি বামপন্থী মাওবাদীরা জমি পেয়েছিল। তারপর সিপিএমকে হটাতে সংগঠন না থাকলেও তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছিল জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা।
একই রকম ভাবে এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করতে পুরুলিয়ার বলরামপুরে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে আদিবাসীরা। এ ক্ষেত্রে ওই এলাকায় বজরং দল ও আরএসএসের পুরনো কিছু সংগঠন রয়েছে। ১৯৯২ সালে যখন ভোট বাড়াতে দেশজুড়ে রাম রথ বের করেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানি সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে এসে পুরুলিয়ার এই এলাকা দিয়ে তাঁর রথ তৎকালীন বিহারে প্রবেশ করেছিল। আরএসএস এবং বজরং দলের অস্তিত্বের কারণেই এই রুট বেছে নিয়েছিলেন আদবানি।
আদিবাসীরা তৃণমূল নেতা নেত্রীর ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে
সেই পুরনো সংগঠনকে কাজে লাগিয়েই এবার ফায়দা তুলেছে বিজেপি। শাসক দলের প্রতি অসন্তোষের কারণেই বিজেপিকে ভোট দিয়েছে ওই এলাকার মানুষ। সেখানে তলায় তলায় কংগ্রেস ও বিশেষত সিপিএমের কর্মী সমর্থকরা বিজেপিকে সমর্থন করেছে।
তুমুল তৃণমূল বিরোধী সিপিএম কর্মী সমর্থকরা বিজেপিকেই আশ্রয় করেছে। বিজেপির গা-জোয়ারি রাজনীতি পছন্দ করছেন বাম কর্মী সমর্থকরা। এই পরিপ্রেক্ষিতে পুরুলিয়ার বলরামপুরে রাজনৈতিক সংঘর্ষ তীব্র আকার নিয়েছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষের পরিণামে সেখানে খুনোখুনি চলেছে। সাম্প্রতিক দুটো মৃত্যুর ঘটনায় রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে কি না তা প্রমান সাপেক্ষ। কিন্তু মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক টানাপড়েন অব্যাহত রয়েছে যা এস ওয়াজিদ আলীর ভাষায় "সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।"
যে সমস্ত এলাকায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীরা কিছুটা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সেখানে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে ততই রাজনৈতিক উত্তাপ যে বাড়বে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে লাশের রাজনীতি।

