এ আর রহমানের কন্যা নিজের ইচ্ছায় বোরখা পরেন, তাঁর পছন্দ নারীবাদী আন্দোলনকে আঘাত করেছে

কেউ যদি বলেন নিজের ইচ্ছাতেই বোরখা পরেন, তাহলেও কি বলা হবে তিনি বাধ্য হয়েছেন?

 |  3-minute read |   10-02-2019
  • Total Shares

"পছন্দ" শব্দটি বেশ গোলমেলে। স্বাধীন ইচ্ছেটাই নিজের পছন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু কখনও কখনও সেই ইচ্ছাটাই যে স্বাধীন থাকে না। একজনের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি ও তিনি কী ভাবে বেড়ে উঠেছে এই ধরণের বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাঁর ইচ্ছাটা নির্ভর করে থাকে।

জীবনের পছন্দটা ঠিক কী - এই বিষয়টি কিন্তু অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে একজন মহিলার জীবনের বাধ্যবাধকতা ও তাঁর 'স্বাধীন ইচ্ছা'র মধ্যে ক্রমান্বয়ে সংঘাতের মাঝে।

ঐতিহ্য, প্রথা ও ধর্মের নামে আমাদের উপর আমাদের পছন্দগুলোকে চাপিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে।

যখন একদল মহিলা শবরীমালা মন্দিরের মহিলাদের প্রবেশাধিকারের উপর নিষেধাজ্ঞার সমর্থন করেছিলেন তখন আদতে মনে হতেই পারে তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত পছন্দের কথা বলছেন। কিন্তু একটি গভীরে চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে এই তাঁরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি এবং এই সমাজের রীতিনীতি তাঁদের মনে এমন জায়গা করে নিয়েছে যে তাঁরা শুধু তা পালনই করেন না তাঁরা এই রীতিনীতির বিরুদ্ধে কোনও দিনও প্রশ্নও তোলেননি।

ঘোমটা, সিঁদুর বা মঙ্গলসূত্র কিংবা স্বামী বা পুত্র সন্তানের মঙ্গলকামনায় মহিলারা যে উপবাস করেন তা কিন্তু শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অঙ্গ ভিন্ন আর কিছুই নয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে এই রীতিনীতি বিশ্বাস করেন। অনেকেই বলে থাকেন যে তাঁরা নাকি নিজের পছন্দে এই রীতিনীতি পালন করে চলেছে।

মুসলমান মহিলাদের বোরখাও একই জিনিস।

তাই গায়ক তথা সঙ্গীত নির্মাতা এ আর রহমানের ২৩ বছরের কন্যা খাতিজা বোরখা পড়ে মঞ্চে ওঠেন তখন সেই দৃশ্যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়।

২১ শতকেও মহিলাদের যদি বোরখার আড়ালে নিজেদের ঢেকে রাখতে হয় তাহলে তা কিন্তু দেশের নারী আন্দোলনের ব্যর্থতা।

বোরখা প্রথা বন্ধের জন্য গোটা বিশ্ব জুড়েই অগণিত মহিলা লড়াই করেছেন। তাঁদের কটূক্তি করা হয়েছে এমনকি শারীরিক নির্যাতনও করা হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কোনও মহিলা যদি এখন বলেন যে নিজের 'পছন্দেই' তিনি বোরখা পড়ছেন তার মানে তিনি কিন্তু নারী আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন।

body_021019040508.jpgমহিলারা যখন পুরুষতান্ত্রিক হয়ে পড়েন [ছবি: পিটিআই]

প্রতিটি ধর্মই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথা বলা হয়েছে। যেখানে খোলাখুলি ভাবে মহিলাদের পছন্দের উপর, শরীরের উপর পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছে। যাতে মহিলারা পুরুষদের ইচ্ছাতেই চলেন। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধর্মেরও তো পরিবর্তন হওয়ার কথা। পরিবর্তন আনতেই হবে কারণ তা হাজার হাজার বছর আগে লেখা হয়েছিল। এখন কেউ যদি নিজের পছন্দের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ধর্ম পালনের জন্য বোরখার আড়ালে থাকতে বাধ্য হন তাহলে তা কিন্তু সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

body1_021019040552.jpgনারীবাদীদের আঘাত করলেন রহমান কন্যা [ভিডিয়ো গ্র্যাব]

যাঁরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মুছে ফেলে নারী স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠানের জন্য আন্দোলন করেছেন বা এখনও আন্দোলন করে চলেছেন তাঁদের কাছে আমরা ঋণী। এ আর রহমান তাঁর কন্যাকে নিয়ে যতই গর্ববোধ করুক আমাদের বুঝতে হবে যে বোরখা সমাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক যা মহিলাদের পড়তে বাধ্য করা হয়। অথচ পুরুষদের শালীনতা ও পবিত্রতা নিয়ে কেউ কোনও দিনও প্রশ্ন তোলে না।

কেন তোলা হয় না? এর জন্য অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

body2_021019040642.jpgসমানাধিকারের জন্য মহিলারা কম লড়াই করেননি! [ছবি: রয়টার্স]

বরঞ্চ, আবার সেই 'পছন্দের' প্রশ্নটিতে ফিরে যাওয়া যাক।

পছন্দ কিন্তু নারীবাদীদের 'মোটিভেশন' ছিল। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। অনেকটা সংবিধানের মতো নারী আন্দোলনগুলোকে এবার কয়েকটি মৌলিক তত্ত্ব ঠিক করে নিতে হবে। যা দিয়ে মহিলাদের সব রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার আচরণ এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উপর প্রতিষ্ঠা করা যায়। কারণ, তাই তো যে কোনও মহিলার সত্যিকারের প্রাপ্য।

নিজের পছন্দ নিজেদের ঠিক করার অধিকার কিন্তু মহিলাদেরও আছে।

লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

Writer

VANDANA VANDANA @vandana5

Author is a Delhi-based journalist.

Comment