সম্পাদক পদে সীতারাম ইয়েচুরি জিতলেও, নিয়ন্ত্রণ প্রকাশ কারাটের হাতেই

জাতীয় রাজনীতিতে যেমন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে, বামপন্থী বলয়েও বন্ধুহীন হবে সিপিএম

 |  6-minute read |   22-04-2018
  • Total Shares

বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দেশজুড়ে বিরোধী শক্তিগুলি ঐক্যের সূত্র খুঁজছে। ইতিমধ্যেই তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঐক্যের স্বপক্ষে একটি সূত্রও দিয়েছেন। মমতার সেই সূত্র হল, বিজেপির বিরুদ্ধে যার যেখানে শক্তি আছে, তাকে সমর্থন। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীও তাঁর মতো করে জোট গড়ার চেষ্টা করছেন। এই আবহে হায়দরাবাদে শেষ হল সিপিএেমর পার্টি কংগ্রেস। অধ্যাপক ইরফান হাবিবের মতো বামপন্থীরা আশঙ্কা করছিলেন, হায়দরাবাদে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাধান্য দিয়ে বিজেপি-বিরোধী জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে পরারে সিপিএম। পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত সিপিএমের লাইন অধ্যাপক হাবিরের আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করল।

সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসে প্রায় আট হাজার সংশোধনী নিয়ে ৮০০ মতো প্রতিনিধি যে সিদ্ধান্ত নিলেন, তাতে সিপিএেমর একঘরে হয়ে থাকার বীজটাই পোঁতা হল। জাতীয় রাজনীতির এখন যে প্রবাহ, তাতে সিপিএম কী সিদ্ধান্ত নেবে তার উপর ২০১৯-এর বিজেপি বিরোধী ঐক্য গড়ে ওঠা নির্ভর করছে না। তৃণমূলনত্রী যে ফর্মুলা দিয়েছেন দেশের প্রতিটি কেন্দ্রে বিজেপির বিরুদ্ধে একজন প্রার্থী, সেই ফর্মুলাতে যদি সিপিএম ঐক্যমত পোষণ করে, তা হলে কেরল ছাড়া আর কোথাওই নিশ্চিন্তে জেতার সম্ভাবনা সিপিএম প্রার্থীর নেই। তবু বিজেপি-বিরোধী লড়াইতে যে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা সওয়াল করছেন, তাঁরা মনে করেন, ভুল শুধরে নিয়ে বিজেপি-বিরোধী জাতীয় ঐক্যের ছাতার তলায় সিপিএম আসুক।

body_042218075559.jpgপার্টি কংগ্রেসে তাত্ত্বিক লাইন খোঁজার দ্বন্দ্ব অব্যাহত রইল

শুধু যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি বিরোধিতার ডাক দিয়েছেন তা নয়, রাহুল গান্ধীও নতুন ধরনের জোট তৈরির চেষ্টা করছেন। উত্তর প্রদেশে সোশ্যালিস্ট পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি বৈরিতা ছেড়ে এক হয়েছে। কর্নাটকের নির্বাচন এই মুহূর্তে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন। সেখানেও বিজেপি খুব সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। উন্নাও থেকে কাঠুয়া, ধর্ষণে বিজেপির এমএলএ গ্রেপ্তার ও কাশ্মীরে মেহবুবা মন্ত্রিসভা থেকে দুই বিজেপি সদস্যের পদত্যাগ। এর পাশাপাশি যশোবন্ত সিনহা, অরুণ শৌরী ও শত্রুঘ্ন সিনহার মতো অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এ ছাড়াও কৃষক ও দলিতদের মধ্যে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। এই অবস্থায় সিপিএম এখনও স্তালিনের পুরোনো তত্ত্বের কাঁথা গায়ে দিয়ে চলার কথাই ভাবছে।

স্তালিনের সময় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও অকমিউনিস্ট দলগুলিকে সংস্কারপন্থী হল বলে মনে করা হত। হায়দরাবাদে পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত লাইন মনে করাল, সে পথ থেকে সিপিএম সরে আসেনি। স্তালিনের তত্ত্ব মেনে কমিউনিস্টরা যদি জার্মানিতে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের থেকে মুখ ফিরিয়ে না থাকত, তা হলে নির্বাচনে হিটলারের উত্থান হত না। সিপিএম অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ। সেই কারণেই বিজেপি-বিরোধী জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে সিপিএম এখনও কংগ্রেস ও অ-কমিউনিস্ট দলগুলিকে বিচার করে চলেছে।

body2_042218075803.jpgপলিটবুরো এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রকাশ কারাটের গোষ্ঠীই সংখ্যাগুরু, ফলে সীতারাম পদে থাকলেও ছড়ি ঘোরাবেন কারাটই

আগামী লোকসভা নির্বাচনে সিপিআইএম ক’টি রাজ্যে ক’টি আসনে প্রার্থী দাঁড় করাতে পারবে, তা নিয়ে ধন্ধ থাকলেও পার্টি কংগ্রেসে তাত্ত্বিক লাইন খোঁজার দ্বন্দ্ব অব্যাহত রইল। দেশের প্রায় সব রাজ্যেই শুধু প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাররা নন, তরুণ প্রজন্মও কেন সিপিএম থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকছে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজার চেষ্টা পার্টি কংগ্রেসে খুব একটা দেখা গেল না। যাবতীয় শব্দ খরচ হল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে তা নিয়ে। পার্টি কংগ্রেসে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া প্রতিনিধিরও ভাগ হয়ে গেলেন কারাট শিবিরে ও সীতারাম শিবিরে। দলের অস্তিত্ব কী ভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বাক্সে দলের ভোটারদের যাত্রা কী ভাবে আটকানো যাবে তা নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শোনা গেল না।

যাঁরা বলছেন প্রকাশ শিবিরকে পরাস্ত করে সীতারাম ইয়েচুরির বাম গণতান্ত্রিক ঐক্যের তত্ত্ব পার্টি কংগ্রেসে প্রতিষ্ঠা পেল, আমি তাঁদের সঙ্গে একমত নই। আমার মনে হয়, পার্টি কংগ্রেসে প্রতিনিধিদের মনোভাব বুঝে কয়েকটা শব্দের অদলবদল ঘটিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করলেন প্রকাশ কারাট। পার্টি কংগ্রেস তো আবার বসবে তিন বছর পরে, এই মধ্যবর্তী সময়ে দল চালাবে পলিটবুরো এবং কেন্দ্রীয় কমিটি। সেখানে প্রকাশ কারাটের গোষ্ঠীই সংখ্যাগুরু। ফলে সীতারাম পদে থাকলেও ছড়ি ঘোরাবেন কারাটই। এই কারণে়ই কিছুটা সমঝোতা করলেন প্রকাশ।

তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে আমার মনে হয়, জাতীয় রাজনীতিতে যেমন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে সিপিএম, তেমন ভাবেই বামপন্থী বলয়েও তারা বন্ধুহীন হয়ে পড়বে। অন্যান্য বামপন্থী পার্টিগুলি সময়ের দাবি মেনে জাতীয় ঐক্যের দিকেই ঝুঁকবে আর ভুল সিদ্ধান্তের ফলে বামপন্থীদের মধ্যেও একঘরে হয়ে পড়বে সিপিএম।

বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দেশজুড়ে বিরোধী শক্তিগুলি ঐক্যের সূত্র খুঁজছে। ইতিমধ্যেই তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঐক্যের স্বপক্ষে একটি সূত্রও দিয়েছেন। মমতার সেই সূত্র হল, বিজেপির বিরুদ্ধে যার যেখানে শক্তি আছে, তাকে সমর্থন। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীও তাঁর মতো করে জোট গড়ার চেষ্টা করছেন। এই আবহে হায়দরাবাদে শেষ হল সিপিএেমর পার্টি কংগ্রেস। অধ্যাপক ইরফান হাবিবের মতো বামপন্থীরা আশঙ্কা করছিলেন, হায়দরাবাদে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাধান্য দিয়ে বিজেপি-বিরোধী জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে পরারে সিপিএম। পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত সিপিএমের লাইন অধ্যাপক হাবিরের আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করল।

সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসে প্রায় আট হাজার সংশোধনী নিয়ে ৮০০ মতো প্রতিনিধি যে সিদ্ধান্ত নিলেন, তাতে সিপিএেমর একঘরে হয়ে থাকার বীজটাই পোঁতা হল। জাতীয় রাজনীতির এখন যে প্রবাহ, তাতে সিপিএম কী সিদ্ধান্ত নেবে তার উপর ২০১৯-এর বিজেপি বিরোধী ঐক্য গড়ে ওঠা নির্ভর করছে না। তৃণমূলনত্রী যে ফর্মুলা দিয়েছেন দেশের প্রতিটি কেন্দ্রে বিজেপির বিরুদ্ধে একজন প্রার্থী, সেই ফর্মুলাতে যদি সিপিএম ঐক্যমত পোষণ করে, তা হলে কেরল ছাড়া আর কোথাওই নিশ্চিন্তে জেতার সম্ভাবনা সিপিএম প্রার্থীর নেই। তবু বিজেপি-বিরোধী লড়াইতে যে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা সওয়াল করছেন, তাঁরা মনে করেন, ভুল শুধরে নিয়ে বিজেপি-বিরোধী জাতীয় ঐক্যের ছাতার তলায় সিপিএম আসুক।

শুধু যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি বিরোধিতার ডাক দিয়েছেন তা নয়, রাহুল গান্ধীও নতুন ধরনের জোট তৈরির চেষ্টা করছেন। উত্তর প্রদেশে সোশ্যালিস্ট পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি বৈরিতা ছেড়ে এক হয়েছে। কর্নাটকের নির্বাচন এই মুহূর্তে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন। সেখানেও বিজেপি খুব সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। উন্নাও থেকে কাঠুয়া, ধর্ষণে বিজেপির এমএলএ গ্রেপ্তার ও কাশ্মীরে মেহবুবা মন্ত্রিসভা থেকে দুই বিজেপি সদস্যের পদত্যাগ। এর পাশাপাশি যশোবন্ত সিনহা, অরুণ শৌরী ও শত্রুঘ্ন সিনহার মতো অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এ ছাড়াও কৃষক ও দলিতদের মধ্যে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। এই অবস্থায় সিপিএম এখনও স্তালিনের পুরোনো তত্ত্বের কাঁথা গায়ে দিয়ে চলার কথাই ভাবছে।

স্তালিনের সময় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও অকমিউনিস্ট দলগুলিকে সংস্কারপন্থী হল বলে মনে করা হত। হায়দরাবাদে পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত লাইন মনে করাল, সে পথ থেকে সিপিএম সরে আসেনি। স্তালিনের তত্ত্ব মেনে কমিউনিস্টরা যদি জার্মানিতে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের থেকে মুখ ফিরিয়ে না থাকত, তা হলে নির্বাচনে হিটলারের উত্থান হত না। সিপিএম অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ। সেই কারণেই বিজেপি-বিরোধী জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে সিপিএম এখনও কংগ্রেস ও অ-কমিউনিস্ট দলগুলিকে বিচার করে চলেছে।

body1_042218080002.jpgজাতীয় রাজনীতিতে যেমন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে সিপিএম

আগামী লোকসভা নির্বাচনে সিপিএম ক’টি রাজ্যে ক’টি আসনে প্রার্থী দাঁড় করাতে পারবে, তা নিয়ে ধন্ধ থাকলেও পার্টি কংগ্রেসে তাত্ত্বিক লাইন খোঁজার দ্বন্দ্ব অব্যাহত রইল। দেশের প্রায় সব রাজ্যেই শুধু প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাররা নন, তরুণ প্রজন্মও কেন সিপিএম থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকছে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজার চেষ্টা পার্টি কংগ্রেসে খুব একটা দেখা গেল না। যাবতীয় শব্দ খরচ হল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে তা নিয়ে। পার্টি কংগ্রেসে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া প্রতিনিধিরও ভাগ হয়ে গেলেন কারাট শিবিরে ও সীতারাম শিবিরে। দলের অস্তিত্ব কী ভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বাক্সে দলের ভোটারদের যাত্রা কী ভাবে আটকানো যাবে তা নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শোনা গেল না।

যাঁরা বলছেন প্রকাশ শিবিরকে পরাস্ত করে সীতারাম ইয়েচুরির বাম গণতান্ত্রিক ঐক্যের তত্ত্ব পার্টি কংগ্রেসে প্রতিষ্ঠা পেল, আমি তাঁদের সঙ্গে একমত নই। আমার মনে হয়, পার্টি কংগ্রেসে প্রতিনিধিদের মনোভাব বুঝে কয়েকটা শব্দের অদলবদল ঘটিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করলেন প্রকাশ কারাট। পার্টি কংগ্রেস তো আবার বসবে তিন বছর পরে, এই মধ্যবর্তী সময়ে দল চালাবে পলিটবুরো এবং কেন্দ্রীয় কমিটি। সেখানে প্রকাশ কারাটের গোষ্ঠীই সংখ্যাগুরু। ফলে সীতারাম পদে থাকলেও ছড়ি ঘোরাবেন কারাটই। এই কারণে়ই কিছুটা সমঝোতা করলেন প্রকাশ।

তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে আমার মনে হয়, জাতীয় রাজনীতিতে যেমন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে সিপিএম, তেমন ভাবেই বামপন্থী বলয়েও তারা বন্ধুহীন হয়ে পড়বে। অন্যান্য বামপন্থী পার্টিগুলি সময়ের দাবি মেনে জাতীয় ঐক্যের দিকেই ঝুঁকবে আর ভুল সিদ্ধান্তের ফলে বামপন্থীদের মধ্যেও একঘরে হয়ে পড়বে সিপিএম।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment