পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ধাক্কা খাবে গণতান্ত্রিক অধিকার
এক বিচারপতি বলেছিলেন, বিচারের একটি হল সুবিচার আর একটি অবিচার
- Total Shares
গণতান্ত্রিক পদ্ধতির উপরে অনাস্থা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এটা রাষ্ট্রের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর প্রবণতা। মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল। আমার ভোটাধিকার আছে, আমি মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে পারি, আমি নির্বাচিত হতে পারি, একই ভাবে কাউকে নির্বাচিত করার অধিকারও রয়েছে।
এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাঁরা যদি তাঁদের কাজ করতে না পারেন তখন মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হল সুপ্রিম কোর্ট। সেই সর্বোচ্চ আদালতে গিয়েও যদি রক্ষাকবচ না পাওয়া যায় তখন মানুষ কি করবে?
এই খণ্ডচিত্র গুলোই তৃণমূলের শাসনে বাংলার তথাকথিত 'অবাধ ও শান্তিপূর্ণ' পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের যে রায় মমতা ব্যানার্জির প্রশান্তির কারণ হয়েছে, তা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হলো কি? লুম্পেনদের আরও দুঃশাসন হয়ে ওঠায় উৎসাহিত করল কি? pic.twitter.com/41FtXyivIw
— CPI(M) WEST BENGAL (@CPIM_WESTBENGAL) August 25, 2018
তিন মাস সাত দিন কেটে যাওয়ার পর সর্বোচ্চ আদালত রায় দিল, এটি তাদের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না, সেই রায় তো আগেই দেওয়া যেত। তারা তখনই নিম্ন আদালতে যাওয়ার কথা বলে দিতে পারত। তাই রায় দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধাক্কা দিল।
আমরা বিচারপতিদের ধর্মাবতার বলে উল্লেখ করে থাকি। সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি রায় দিয়েছেন। তাই এই রায় মেনে চলতে হবে। তবে আমরা যদি দূরদর্শী হই তা হলে বুঝব যে ভবিষ্যতের কী ক্ষতি হয়ে গেল। সুপ্রিম কোর্টের অনেক রায়ই পরবর্তীকালে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সুপ্রিম মানে এই নয় যে তাঁরা সব সময়ই সঠিক রায় দিচ্ছেন।
ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাকে হাতিয়ার করে রায় দিয়েছিলেন এইচ আর খান্না। পরে এইচ আর খান্নাকে সরে যেতে হয়েছিল, পরে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট (রয়টার্স)
সুপ্রিম কোর্টে আমরা যাইনি, আমরা প্রথমে হাইকোর্টে গিয়েছিলাম। সুপ্রিম কোর্টই আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছিল। ৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, যাঁরা মনোনয়ন পত্র দিতে ইচ্ছুক, তাঁরা যেন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন সেটি দেখা কর্তব্য সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রের। সেই অনুসারেই রাজ্য নির্বাচন কমিশনার একে সিং একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। তাতে বলা যে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে খবর আসছে যে নির্বাচনী পদ্ধতিতে ব্যাঘাত ঘটানো হচ্ছে। সেখানে মনোনয়ন দাখিল করার মতো পরিবেশ ছিল না। সে জন্য মনোনয়ন পেশের সময়সীমা এক দিন বাড়ানো হল।
পরবর্তী কালে সৌরভ দাস ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনারের বাড়িতে গিয়ে চাপ দিয়ে সেই নির্দেশিকা প্রত্যাহার করিয়ে নেন।
২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর পুরভোট হয়। বিধাননগরে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমরা যখন অভিযোগ দায়ের করি তখন তৎকালীন কমিশনার সুশান্ত উপাধ্যায় যখন উপযুক্ত পদক্ষেপ করতে যাচ্ছিলেন তখন মেয়র, তৃণমূলের মন্ত্রী প্রমুখ তাঁর উপরে প্রবল চাপ দেন, তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এমন নজির এই রাজ্যে নেই। সুসান্ত উপাধ্যায় স.রে যাওয়ার পর সাত দিনের জন্য ওই পদে এলেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। অবৈধ কাজগুলিকে বৈধ করে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। তারপরে নিযুক্ত হলেন অপর্ণা জোশী। নির্বাচন কমিশনের যে স্বতন্ত্র ভূমিকা তাকে তো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে মিছিল পঞ্চায়েত ভোটের সময় (ফাইল চিত্র)
অরুণাভ ঘোষ একবার বলেন যে ইংল্যান্ডের এক বিচারপতি বলেছিলেন যে বিচার (জাজমেন্ট) হয় তার একটা হল জাস্টিস (সুবিচার) আর একটা হয় অবিচার (ইনজাস্টিস)। এই দুটোই রয়েছে আইন ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই। অবিচারকে তো আর আইনি বলতে পারব না। আইন মানে সেখানে বিচার পাব। কিন্তু কখনও কখনও অবিচারও চলে আসে। সেটাও এরই অংশ।
৯ এপ্রিল যে আদেশ দেওয়া হয়, তাতে বলা ছিল, where information has been received through complains, deputation etc. that intending candidates and proposers are being obstructed or prevented from making nomination. Where as many intending candidates could not file their nomination papers due to the above disruption. Where as along with complaints made by the political parties made by some nominations papers are allegedly could not submit before panchayat returning officer have been annexed. Where as some political parties wanted to submit some nomination papers today, the office of the state election commission which cannot be done as per law as it is supposed to be submitted before panchayat returning officer only at SDO office or BDO office and where as Honourable Supreme Court of India has been directed to the commission in its solemn order connection with writ petition 302/2108 dated 9th April considered that grievance played by any party or by any candidate as the case may be and pass appropriate order so that intending candidate may not be deprived of their chance to contest the panchayat election. Now therefore the Commission, in exercise of the power conferred upon it by provisio in sub-section (2) of the Section 46 of the West Bengal Panchayat Election Act 2003 here by extend the last date of making nomination for one day that is on 10th April 2018 from 11am upto 3pm.
পঞ্চায়েত ভোটে হিংসার ছবি (ফাইল চিত্র)
এর মধ্যে একটি সর্বোচ্চ আদালত ও আরকটি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ। ১০ তারিখেই যখন চাপের মুখে নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয় তখন সেই নির্দেশের মধ্যেই লেখা হয়, যে তৃণমূলের চাপেই তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তা হলে যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করার জন্য এগোচ্ছিল নির্বাচন কমিশন সেই নির্বাচন কমিশনকে পঞ্চায়েতের বিশেষ আধিকারিক সৌরভ দাস এবং তৃণমূলের সহ-সভাপতি বাধ্য করলেন প্রত্যাহার করতে। মনে রাখতে হবে যে ওই নির্দেশেই বলা হয়েছে তৃণমূলের ভাইস প্রেসিডেন্টের কথা। এতেই স্পষ্ট যে ক্ষমতাসীন দলের চাপেই তা হয়েছে।
আমরা প্রথম থেকে শুধু চেয়েছিলাম মনোনয়ন জমা করার সুযোগ পেতে। যখন হচ্ছে না তখন ভাঙড়ে মনোনয়ন পেশ করা হল হোয়াটসঅ্যাপে। প্রশাসন তখন কাউকে কোনও নিরাপত্তাই দিতে পারছে না। আলিপুরে সাংবাদিকদের মারধর করা হল। তখন ভাঙড়ের হয়ে শর্মিষ্ঠা চৌধুরী ব্যক্তিগত ভাবে বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের বেঞ্চে সওয়াল করেন হোয়াটসঅ্যাপে মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে। তখন আইনজীবীদের ধর্মঘট চলছে। তাই নির্বাচন কমিশনের সচিব নীলাঞ্জন শাণ্ডিল্যের কাছে বিচারপতি জানতে চান তিনি সেই মনোনয়ন গ্রহণ করবেন কিনা। তাতে শান্ডিল্য কোনও আপত্তি করেননি। তখন বিচারপতি বলেন শুধু আপত্তি না করলেই হবে না, গ্যারান্টি দিতে হবে যাতে নামগুলি ব্যালটপেপারে থাকে। উভয়পক্ষ রাজি হওয়ার পরেই রায়দান করা হয়। তাঁদের কয়েকজন জয়ীও হয়েছেন। পরে ঋজু ঘোষাল এবং আরও পরে বিকাশ ভট্টাচার্যের মামলার প্রেক্ষিতে জানিয়ে দেওয়া হয় যে অন্য কোনও ভাবে যখন মনোনয়ন দেওয়া যাচ্ছে না তখন ই-ফাইলিং হবে। তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন সর্বোচ্চ আদালচতে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারে বলা হয়, ২০০৩ সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইনে যেহেতু ই-মনোনয়নের কথা উল্লেখ নেই তাই তা গ্রহণ করা হবে না।
রায়ে বলা হল যে ২০০০০ আবেদনের যে কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তাঁদের কাছে কোনও নথি জমা পড়েনি। মাত্র ১৭০০ হয়েছে, ১৬৮টি আবেদন জমা পড়েছে। উপযুক্ত সাক্ষীও আসেনি। তাই তাঁরা তাতে মান্যতা দিতে পারছেন না। এবং এটি তাদের এক্তিয়ারের বাইরে। এর জন্য ইলেকশন পিটিশন করতে হবে।
সংবিধানের ১৪২ নম্বর ধারায় যেখানে সর্বোচ্চ আদালতকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে সেখানে গেজেট নোটিফিকেশন হওয়ার পরে ৩০ দিন সময় দেওয়া হল। সেই সময়ের মধ্যে আবেদন করা যাবে।
প্রশ্ন হল তিনমাস পরে কেন আবার এক মাস সময় দেওয়া হল? নতুন করে ২০০০০ জন যদি নিম্ন আদালতে আবেদন করেন সেই মামলার রায় কবে প্রকাশ হবে তা কে জানে? ৫-৭ বছর পরে যদি রায় দেওয়া হয় তাতে কী হবে? রাজ্যে কত মামলা ঝুলে রয়েছে তা কি কারও অজানা আছে?
কলকাতা হাইকোর্ট
বিচারপতি বলেছিলেন তখনই বিবেচনা করবেন যদি ২০১৩ সালের থেকে নির্বাচনের হিংসায় যা মৃত্যু ঘটেছিল তার চেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে। সেক্ষেত্রে যাঁরা সংশ্লিষ্ট আধিকারিক তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। মোট ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বেই সবচেয়ে বেশি লোকের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে তৃণমূলেরই, তাদের অভ্যন্তরীর কারণে।
তা হলে তিন মাস ধরে সর্বোচ্চ আদালত দর্শ ভূমিকা পালন করে জনগণের অর্থ খরচ করে তাঁরা কী রায় দিলেন? এই রায় তো এক দিনেই দেওয়া যেত। মহারাষ্ট্রের নির্বাচনী আইনে ছিল, সে জন্য তারা ই-ফাইলিং করতে পেরেছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আইনে নেই, তাই এক্ষেত্রে ই-মনোনয়ন জমা দেওয়া সম্ভব নয়। আইন আমরা করেছিলাম, তখনকার কথা ভেবে। এখন তো তা সময়োপযোগী করতে হবে। আগে শুধুমাত্র ব্যালটে ভোট হত, তারপরে ইভিএম এসেছে, এখন আরও ভিভিপ্যাড যুক্ত হবে। আইনও তো সেই ভাবে বদল করতে হবে। সাত বছর ধরে এই সরকার রয়েছে, তারাই আইনের সংশোধন করেনি। তা হলে তারা এ জন্য দায়ী?
এই রায়ের ফলে রাষ্ট্র সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে, এই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। তাই এটা গণতন্তের পক্ষে মারাত্মক। ইতিহাসেও দেখতে পাবেন, হিটলার-মুসোলিনিও গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, পরে তাঁরা বিচারবিভাগের সহায়তা পেয়েছিলেন।

