আইসিসের সঙ্গে গণপ্রহারে মৃত্যুর তুলনা করেছেন রাহুল, তাতে কী!
আমাদের দেশের রাজনৈতিক বক্তৃতা কতটা অন্তঃসারশূন্য তা ফের প্রমাণিত
- Total Shares
রাহুল গান্ধীর বিদেশ সফর মানেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ও সাংবাদিকরা (এঁদের অনেকই আবার সোশ্যালমিডিয়া ব্যবহারকারী) বেশ টান টান উত্তেজনা অনুভব করেন। ভারত থেকে উড়ান ধরার পরেই কি রাহুল গান্ধীর আর হদিশ পাওয়া যাবে না নাকি বিদেশের কোনও মঞ্চে তাঁকে বক্তৃতা করতে দেখা যাবে, যেমন জার্মানিতে তিনি বক্তৃতা করলেন। তাঁর বিদেশসফর ঘিরে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
জার্মানিতে তিনি এমন বক্তৃতা করলেন যা এ দেশে আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এবার দেখা গেল আমাদের দেশের রাজনৈতিক বক্তৃতা কতটা অন্তঃসারশূন্য হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক নেতারা রাজনীতির কথা বলে থাকেন, কারণ এটাই তাঁদের কাজ। এই ধরনের বক্তৃতা করতে গিয়ে তাঁরা মিথ্যার আশ্রয় নেন, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন এবং পরিবেশটিকে বেশ ঘোরালো করে তোলেন। বিপরীত শিবিরে থাকা নেতারা তখন ‘ঘটনা’টি কী সে কথা বলেন এবং পাল্টা বক্তৃতা করে প্রকৃত ঘটনা (কাউন্টার ফ্যাক্টস) বলার চেষ্টা করেন।
সময়টাই এগিয়ে যায়, অন্য কোনও পরিবর্তন হয় না।
জার্মানির হামবুর্গে বুসেরিয়াস সামার স্কুলের ক্যাম্পনাগেল থিয়েটারে যে জমায়েতে রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে যে আক্রমণ করলেন তা ছিল অনাবাসী ভারতীয়দের কাছে তাঁর অবস্থান তুলে ধরার জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানেই তিনি সারা দেশে যে পিটিয়ে হত্যা নিয়ে খবর প্রকাশিত হচ্ছে তার সঙ্গে আইসিসের তুলনা করেন।
অনাবাসী ভারতীয় ও সেই সমাবেশে থাকা বিদেশিদের কাছে রাহুল গান্ধী বলতে চেয়েছেন কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকারের ব্যর্থতা এবং বিমুদ্রাকরণ ও ত্রুটিপূর্ণ ভাবে পণ্যপরিবহণ কর বাস্তবায়নের মতো ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের কথা যার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান থেকে তরুণদের বিচ্ছিন্ন করেছে এবং একই সঙ্গে বহু মানুষ ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি চেতাবনি দিয়ে বলেছেন যে এই ধরনের সিদ্ধান্তের ফলেই গণপ্রহারে মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটাচ্ছেন তরুণরা।
এতক্ষণ পর্যন্ত সব তবু ঠিকঠাক চলছিল।
তারপরেই তিনি ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলেন, ইরাকে কোনও একটি উপজাতি গোষ্ঠীকে সরকারি চাকরির সুযোগ না দেওয়ায় আইসিসের কী ভাবে উত্থান হল।
দেশে কর্মসংস্থানের শোচনীয় দশা নিয়ে বিজেপি সরকারকে আক্রমণ রাহুল গান্ধীর (ছবি: টুইটার)
রাহুল গান্ধী বললেন, নরেন্দ্র মোদী “ভারতীয় অর্থনীতির বিমুদ্রাকরণ করেছেন এবং নগদের জোগান বন্ধ করেছেন” সমস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রগুলিতে যার ফলে বহু মানুষ কর্মহারা হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “পণ্য ও পরিষেবা কর সম্পর্কে তাঁদের খারাপ ধারণা তৈরি হয় এবং পরে সেই কর ব্যবস্থা আরও জটিল হয়।”
তিনি বলেন, “ছোট ব্যবসা করতেন এমন বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হন এবং সরকারের এই তিনটি কাজের জন্য দেশের সব মানুষই ক্ষেপে উঠেছেন। এবং এই সব কথা আপনারা সংবাদপত্রেও পড়েছেন। যখন আপনারা গণপ্রহারে মৃত্যুর কথা জেনেছেন তখন এ কথাও জেনেছেন যে ভারতে দলিতদের উপরে আক্রমণ করা হচ্ছে, নিশ্চয়ই জেনেছেন যে সংখ্যালঘুদের উপরে আক্রমণ করা হচ্ছে। এটাই তার কারণ।”
রাহুল গান্ধী বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে, যখন পুরো পুরো বিশ্ব একে অপরের সঙ্গে যুক্ত, তখন মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া মারাত্মক কাজ। ২০০৩ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ করল তখন তারা একটি আইন চালু করেছিল যে একটি নির্দিষ্ট উপজাতিকে সরকারি চাকরির কোনও সুযোগ দেবে না... খুব বেশি লোকের মৃত্যু না ঘটিয়েই কয়েক মাসের মধ্যে সহজেই সাদ্দাম হুসেনকে কব্জা করা সম্ভব হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। কিন্তু ইরাকে যে তিকরিতি উপজাতির মানুষজনকে সরকারি কাজ থেকে বঞ্চিত করা হল, কয়েক মাস পরেই দেখা গেল তারা সেলফোন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং গ্রামে একটি অস্ত্র-চক্র তারি হয়েছে। আরেকটি জিনিস দেখা গেল, তা হল বিদ্রোহ—মার্কিনিদের সঙ্গে তাদের লড়াই হল, প্রচুর প্রাণহানি হল। এখানেই শেষ নয়, ইরাক ও সিরিয়ায় এই শূন্যস্থান পূরণ করতে একটি ভয়ানক ধারণার জন্ম হল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে – আইসিস।”
জার্মানিতে অনাবাসী ভারতীয়দের সভায় রাহুল গান্ধী (ছবি: টুইটার)
রাহুল গান্ধীর কথা বলার ধরন দেখে মনে হয় যে তিনি যতাসাধ্য সহজসরল ভাবে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের কোনও কিছু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন, হতে পারে যে ঠিক এই ভাবে বিষয়টি তাঁকে কেউ বুঝিয়েছিল। তবে এ কথা অবশ্য পুরোপুরি অনুমানভিত্তিক।
রাহুল গান্ধী যখন রাজনৈতিক জটিলতা বোঝার মতো পরিপক্ক হয়ে উঠবেন তখন হয়তো তিনি তাঁর সেটা বক্তৃতাটি করবেন ততক্ষণে আইসিস ও চরমপন্থার প্রসঙ্গে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিজেপি দারুণ একটা বক্তৃতা করে দেবে।
জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে একে জুড়ে দিয়ে এমন একটি সাম্প্রদায়িক ইস্যু তৈরি করে ফেলবে যে তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসা বেকারত্বের মতো বিষয়গুলিকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
কোনও কারণ ছাড়াই দেশের রাজধানী শহরের পথে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে শিশুরা, শিক্ষার মান এতটাই খারাপ যে স্কুলে যাওয়ার পরেও অনেকেই পড়তে ও লিখতে পারছে না— তা নয়। সত্যিকারের ঘটনা হল, সাধারণ মানুষ বিক্রীর জন্য উপযোগী পণ্য নয়।
সে জন্য – ইরাক ও সিরিয়ায় আইসিসের উত্থান ও ভারতে গণপ্রহারে মৃত্যুর যোগ নিয়ে তর্ক চলতেই থাকবে – তা সে যত অপ্রয়োজনীয়ই হোক না কেন।
লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

